করোনায় চিরবিদায় নেয়া স্বামীকে নিয়ে স্ত্রীর আবেগঘন স্ট্যাটাস

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে সবাইকে ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছেন স্বামী আলম আকন্দ। তাকে নিয়েই স্ত্রী রুকসানা হোসেইন আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। স্ট্যাটাসটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো

‘‘আজকে সেই ১৪ দিন, আমি আবার লাইভে আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু না, আমি পারলাম না। আমি হেরে গিয়েছি। যুদ্ধ করতে করতে আমি করোনা ভাইরাস; যাকে বলছে কোভিড-১৯ তার কাছে হেরে গেলাম। আমি সে সময় বিলিভ করতে পারছিলাম না যে আলমের করোনা পজিটিভ। অথচ সে তার শরীরে করোনা নিয়ে আমাকে সেভ করে গেল। আমরা সবাই এখন আলহামদুলিল্লাহ ভালো এবং সুস্থ আছি, শুধু আলম (আমার হাজবেন্ড) নেই আমাদের মাঝে। সে বুঝতে পেরেছিল তার সময় শেষ; করোনার মহামারী থেকে রক্ষা করতে শুধু ইদ্দাতের ৪ মাস ১০ দিন না, আগের ১৪ দিনসহ রক্ষা করে গেল আমাকে।

যদি তার করোনা পজিটিভ না আসত, আমাকে ঘর থেকে বের হতে হত; প্রতিদিন হসপিটালে যেতে হত; আমি করোনা সংক্রমিত হতে পারতাম। কিন্তু সে জানেনা, করোনার ভয়াবহতার কাছে ঘরটাও নিরাপদ না। হসপিটালের ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিট স্পেশাল ডিপার্টমেন্ট এ থেকেও যদি তাকে করোনা স্পর্শ করতে পারে আর সেই হিসেব করলে ঘর তো কিছুই না, আমাকে স্পর্শ করা আরও সহজ।

আমাকে হোম কোরেন্টাইনে পাঠাবার ৩ দিন পর, ২০ তারিখ শুক্রবার আলম নার্স এর মোবাইল দিয়ে একটা কল দেয়, এই কলটা যে লাস্ট কল হবে, এটাই যে শেষ কথা হবে কে জানতো? সে তার মোবাইলটা খুঁজছে, আমি বললাম এক্ষুণি নিয়ে আসতেছি। ডাক্তারের কাছ থেকে পারমিশন নিলাম এবং সে মোবাইল ইউজ করার মত স্টেবল আলহামদুলিল্লাহ, সেটাও জেনে নিলাম। ডাক্তার আরও বললো এই অবস্থায় দুই দিন থাকলে, তাকে সোমবার নাগাদ আইসিইউ থেকে ওয়ার্ডে ট্রান্সফার করতে পারবে ইনশাল্লাহ।

আলহামদুলিল্লাহ অবস্থার উন্নতি দেখে তাড়াতাড়ি রওনা হলাম। আমার বাচ্চারা আমাকে টেনে ধরে না মামণি তুমি বের হবে না, আমরা মাকে হারাতে চাই না, বাবা অসুস্থ, তুমিও অসুস্থ হলে আমরা কার কাছে যাবো। কিছুই হবে না আমাদের ইনশাল্লাহ, আল্লাহর উপর ভরসা রাখ বলে বেড়িয়ে গেলাম।

প্রায় এক ঘন্টার মেট্রো জার্নি আমার বাসা থেকে হসপিটাল। কোয়ারেন্টিন ভেঙে ছুটে চললাম হসপিটালে। একটা পাথর, একটা তাসবিহ, মোবাইল আর কিছু টাকাসহ ছোট একটা ব্যাগ ডাক্তারের হাতে দিয়ে রিকুয়েস্ট করলাম একটা বার আমাকে দেখার সুযোগ করে দাও। না কোনভাবেই যেতে পারলাম না আলমের কাছে। কিন্তু সে ঠিকই অনুভব করেছিল, আমি তার অনেক কাছে এসেও তার সাথে দেখা করতে পারি নাই। তাই শুক্রবার বিকেল থেকে আজকে পর্যন্ত আর সাড়া দেয় নাই কারও ডাকে। আমার ব্যাগটা তার হাত পর্যন্ত পৌছানো হয়েছিল কিনা আমি তাও জানি না। মোবাইল ইউজ করবে, পাথর দিয়ে তায়াম্মুম করবে আমি সেই অপেক্ষায় ছিলাম।

কিন্তু সে আর চোখ খুলে পৃথিবীর আলো দেখেনি লাস্ট ডে পর্যন্ত। এর ভিতরে আমাকে দুইবার ভিডিও কলে দেখানো হয়েছিলো। অনেক ডেকেছিলাম ভিডিও কলে, তারপরও চোখ খোলেনি। চলে গেছেন জান্নাতে। এইভাবে করোনা পৃথিবীর বুকে করুণ ইতিহাস লিখে যাচ্ছে।

করোনা লন্ডনে কি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তা এক সপ্তাহ আগেও আমি আন্দাজ করতে পারিনি। তাই ডাক্তারদের উপর অনেক রাগ হচ্ছিল আমার। আইসিইউ-এর ভিতরে কীভাবে করোনা প্রবেশ করতে পারে বা আমাকে কেন টেস্ট করা হচ্ছিল না ইত্যাদি নিয়ে। আসলে আমি ভুল ছিলাম। হসপিটাল ভর্তি এত মুমূর্ষু করোনার রোগী রেখে, আমাকে তারা কেন টেস্ট করবে? যেখানে আলহামদুলিল্লাহ আমার কোন সিমটম ছিল না। টেস্ট করেও যদি পজিটিভ আসত, তাহলেও করার কিছু ছিল না। সেল্ফ আইসোলেশন মানে অন্যের থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকা ছাড়া কিছুই করার নেই। যেটা এখন আমরা সারা বিশ্বের প্রায় সবাই করছি। অন্যের থেকে দূরে থাকা যায়, কিন্তু সন্তান মা এদের থেকে দূরে থাকা যায় না; যেমনটা আমি পারিনি।

আলম করোনার রোগী হওয়ায় আমি দেখেছি ডাক্তার নার্সদের সার্বক্ষণিক কঠিন প্রচেষ্টা। এখন বুঝতে পারছি কত রোগী হলে সরকার প্রাক্তন ১১ হাজার ডাক্তার, ২৪ হাজার ফাইনাল ইয়ারের মেডিকেল স্টুডেন্ট এবং আড়াই লক্ষাধিক সেচ্ছাসেবীদের করোনা রোগিদের পাশে দাঁড়াতে বলছে। আমি স্যালুট জানাই সকল ডাক্তার নার্স সেচ্ছাসেবীদের, যারা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন আমাদের জন্য।

হে আল্লাহ আপনিই সকল শক্তির মালিক। আপনিই পারেন আমাদের এই মহা বিপদ থেকে উদ্ধার করতে। আপনি আমাদের ক্ষমা করুন।’’


সর্বশেষ সংবাদ