এসএসসির পর লম্বা ছুটি যেভাবে ভালো কাজে লাগানো যায়

  © সংগৃহীত

শেষ হওয়ার পথে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষা। অনেকে কলেজে ভর্তির প্রস্তুতি শুরু করেছে। তবে এসএসসির পর লম্বা ছুটিতে আরও অনেক কিছু করার চেষ্টার করছে অনেকে।  সৃজনশীল কিছু শেখার বা চর্চা করার প্রস্তুতিও নিশ্চয়ই নিচ্ছে অনেকে।

আমরা থাকতাম আজিমপুর সরকারি কোয়ার্টারে। বিকেলে ছেলেমেয়ে ব্যাডমিন্টন খেলতাম। সন্ধ্যায় ধূলিধূসর পায়ে ফিরে হাত–মুখ ধুয়ে বই নিয়ে শুয়ে পড়তাম। এসএসসি পরীক্ষা শেষে হাতে অফুরন্ত সময়। একগাদা বই কেনা হয়েছে। আমার আবদারে বিরক্ত হয়ে বাবা নিউমার্কেট থেকে অনেক বই কিনে দিয়েছেন। বন্ধুদের সঙ্গে অদল-বদল করে আরও বই এনেছি। বই পড়ে তা–ও সময় কাটে না।

নিচতলার ময়না আপু ওয়াইডব্লিউসিএ স্কুলে ছবি আঁকা শিখতে যায়, দেখে জেদ ধরলাম আমিও শিখব। ভর্তি হয়ে সপ্তাহে দুই দিন আপুর সঙ্গে ছবি আঁকা শিখতে যাই। নতুন অবস্থায় প্রচণ্ড আগ্রহ ছিলো। এভাবেই এসএসসির পরের ছুটিটা দ্রুত শেষ হয়ে গেল।

তখনো কলেজ ভর্তি কোচিং চালু হয়নি। কোন কলেজে পড়ব, তা নিয়েও মাথাব্যথা ছিল না। তার ঠিক ৩০ বছর পরে আমার ছেলে যুহায়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী। ব্যবহারিক পরীক্ষা সামনে। গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল কেন্দ্রের সামনে অভিভাবকদের বলতে শুনি, কলেজে ভর্তির কোচিংয়ের ফরম নিয়েছেন? কোন কলেজে ভর্তি করাবেন? এইচএসসিতে স্যারের বাসায় পড়ার সময়ই মেলে না! দেখেশুনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। খালি নামে ভুললেই হবে না।

স্কুলের গেটের সামনে কোচিংয়ের লিফলেট বিতরণ হচ্ছে। প্রতিদিন মোবাইল ফোনে আসছে নানা কোচিং সেন্টারের মেসেজ। ইংরেজির একটা কোচিং সেন্টার রীতিমতো স্টল খুলে বসেছে। দ্রুত অনর্গল ইংরেজি শেখাতে এক মাসের র‌্যাপিড কোর্স চালু করেছে তারা। বাজারে মোটিভেশনাল ও জীবন গড়ার বইয়ের চাহিদা থাকায় অনেকে সন্তানদের এসব বই কিনে দিতে আগ্রহী।

একজন বললেন, পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই অনেকে সন্তানদের কোচিংয়ে ভর্তি করিয়েছেন।পরীক্ষার পর ছুটিতে কী করবে ওরা? যুহায়েরকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, ‘বাসার বিভিন্ন কাজ আমাকে করতে বলবে না কিন্তু। আমি কী করব বলব না!’

কী আর করবে! ওদের কম্পিউটার, সেলফোন, আইপ্যাড- কত কী আছে! একজন মা বললেন, ‘আমি সাফ বলে দিয়েছি, ছুটির মধ্যে প্রোডাকটিভ কিছু করতে হবে। ছোটখাটো কোর্সে ভর্তি করে দেব ভাবছি। আচ্ছা, ফ্রেঞ্চ ভাষা শিক্ষা কোর্সের খোঁজ নিয়েছেন? কাজে লাগতে পারে। সাঁতারের ক্লাসেও নাম দিয়ে রেখেছি।’

অকারণেই সে সময় চার বছর ছবি আঁকা শিখেছি। পরের দিকে আগ্রহও মরে গিয়েছিল। কিন্তু চিত্রকর্ম আর ভাস্কর্যের প্রতি ভালোবাসা গড়ে দিয়েছিল ক্লাসগুলো। এই বয়সে এসে গোটা সকাল রেনে সোফিয়া মিউজিয়ামে পিকাসোর গোয়ের্নিকার সামনে স্তব্ধ বসে থাকা শিখিয়েছে ওটা। প্যারিসের মোমার্তে শিহরণ তোলা অনুভূতি জাগাতে পেরেছে।

এসএসসির পর সমরেশের গর্ভধারিণী পড়েছিলাম, জয়িতাই আমার বড় মোটিভেশন তখন। ফেলুদা বা মাসুদ রানাকেও অনুপ্রেরণাদায়ী চরিত্র হিসেবে পেয়েছি। আশাপূর্ণা দেবীর প্রথম প্রতিশ্রুতি, সুবর্ণলতা, বকুলকথা না পড়লে কিশোরী বয়সে অনুপ্রেরণা পেতাম কি না, সন্দেহ। আলাদা কোনো বই পড়তে হয়নি, সত্যজিৎ-সমরেশ-সুনীলরাই যথেষ্ট ছিলেন। এখন মোটিভেশনের এত অভাব যে, আলাদা বই পড়ে ‘মোটিভেটেড’ হতে হয়!

তার মানে এই নয় যে ছুটি মানেই আনন্দ আর খেলা। ছুটিতে অনেক কিছুই করা যেতে পারে। গত বছর আমার বন্ধুর মেয়ে শ্রেয়া ছুটিটা কাটিয়েছিল পথশিশুদের একটা স্কুলে পড়িয়ে। দারুণ ব্যাপার, তাই না? এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সুন্দর কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত হওয়া যায়, করা যায় কোনো ভালো কাজ।

বাড়িতে মা–বাবাকে সাহায্য করাও ভালো কাজ। কারও যদি কিছু শিখতে মন চায়, যেমন গিটার বা বেহালা বাজানো, কারাতে শেখা, ভাষা শেখা ইত্যাদি- এ সুযোগে করা যায়। এগুলো কোনো কাজে আসবে কি না, না ভেবেই মনের খোরাক জোগানোর জন্য করা যায়। সবকিছু কাজে আসতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।

বেড়াতে তো যাওয়াই  যায়। ভ্রমণ মানুষকে উজ্জীবিত করে, চোখ খুলে দেয়। আর বই পড়ার এমন অবসর কমই মেলে। এই সময়টাতে বেশি বই পড়ে শেষ করেছি আমি। জীবনটা বদলে যাবে ভালো বই পড়লে। আর লেখাপড়া তো করতেই হবে, এই প্রতিযোগিতার যুগে টিকে থাকতে। তবে ভালো ক্যারিয়ারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো কলেজে ভর্তি হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।

কম নামকরা কলেজ থেকেও ভালো ফল করা যায়। আমার এক বন্ধু মেলবোর্নে বিরাট গবেষক, নামকরা সব জার্নালে তাঁর গবেষণাপত্র ছাপা হয়। অচিরেই বিশেষ ধরনের ইনসুলিন আবিষ্কার করতে যাচ্ছে। সে কিন্তু পাস করেছে এক মাদ্রাসা থেকে। পড়াশোনা ও জানার আগ্রহটাই আসল। সঙ্গে চাই অধ্যবসায় আর ধৈর্য। পরাজিত হয়েও উঠে দাঁড়ানোর সাহস। সবার ছুটিটা সুন্দর আর অর্থবহ হোক।


মন্তব্য

এ বিভাগের আরো সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ