অনলাইন ক্লাস বন্ধ চান শাবিপ্রবি শিক্ষার্থী

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশে সব ধরণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এসময় শিক্ষার্থীদের পাঠদান চালু রাখতে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন। কিন্তু জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ায় ইন্টারনেট ক্রয় করতে না পারা এবং অনেক শিক্ষার্থীর ডিভাইস না থাকার অভিযোগ তুলে অনলাইন ক্লাস বন্ধ করতে উপাচার্য বরাবর খোলা চিঠি লিখেছেন বাদশা বুলবুল নামের এক শিক্ষার্থী।

খোলা চিঠিটি তুলে ধরা হলো-

পৃথিবীর সব দেশের মানুষ যখন করোনা ভাইরাসের মহামারী নিয়ে আতংকিত, সবাই যেখানে গৃহবন্দী। নিজের জীবন বাঁচানো নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। সেই কঠিন সময়ে আমরা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছি অনলাইন ক্লাসে। বিষয়টি এরকম কি জীবন থাকলে থাকুক না হলে না থাকুক, কিন্তু ক্লাস তোমাকে করতেই হবে?

বৈশ্বিক এ দুর্যোগে বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষার্থীদের সেশনজটমুক্ত করার লক্ষ্যে অনলাইন ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। প্রযুক্তির এ যুগে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত অবশ্যই সাধুবাদ যোগ্য। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট ও আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থায় তা কতটুকু ফলপ্রসূ তা আমার বোধগম্য নয়।

পুরো দেশ এখন লকডাউনে বন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত এবং তারা মফস্বল এলাকা থেকে আগত। এই লকডাউনে আমাদের মধ্যে অনেকের ফ্যামিলির ইনকাম বন্ধ, যারা নিম্নবিত্ত/মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি থেকে বিলং করতেছে, তাদের এখন আগামী ১ মাস ঘরে বসে কিভাবে পুরো ফ্যামিলির ভরণ-পোষণের খরচ চালাবে সেই চিন্তা করতেছে। চিন্তা করছে, মুরুব্বি ও শিশুদের ওষুধ খরচ কিভাবে জোগার করবে। এমতাবস্থায় তারা সেখানে প্রতি ক্লাসের জন্য ৫০০ এমবি থেকে ২ জিবি (বিভিন্ন ডিভাইস ভেদে মেগাবাইট কম/বেশি লাগতে পারে) উচ্চ মূল্যের ইন্টারনেটের টাকা কোথায় পাবে?

দেশের অধিকাংশ এলাকায় নেটওয়ার্কের অবস্থা অনেকটা গরুর গাড়ীর মতো। যেখানে একটা ম্যাসেজ সেন্ড করে ১-২ মিনিট লোডিং নেয় সেন্ড হতে। সেখানে ভিডিও কলে কেমন স্পিড আশা করি সকলের বোধগম্য। আপনারা হয়তোবা ২-৩ দিনের অনলাইনের ক্লাসে দেখেছেন, কেউ ঘাটে, কেউ, মাঠে, কেউ গাছ তলায়, কেউবা আবার গাছের উপরে উঠে বসে আছে। কেন জানেন, ইন্টারনেটের ৫জি উচ্চ গতির কারণে। আর কানেকশনের কথা কি বা বলবো। আমাদের বাড়ীর পাশে টাওয়ার থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি ক্লাসে ১০-১৫ বার ডিস্কানেকটেড হয়ে যাই। আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কানেক্টেড হতে পারছে না।

গতকাল আমাদের এলাকায় একজন করোনার উপস্বর্গ নিয়ে মারা গেছে। বেশ কিছু মানুষকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। এই রকম একটা অবস্থায় এলাকায় ভীতিকর একটা অবস্থা বিরাজ করতেছে। আর আমাদের এলাকায় এখন শুধু মাত্র ওষুধের দোকান ছাড়া সব দোকানপাট বন্ধ, জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া নিষেধ। এখন আমি কিভাবে মোবাইলে ফ্লেক্সিলোড দিবো? আর কিভাবে ইন্টারনেট কিনবো? বাইরে সেনাবাহিনী এবং পুলিশের টহল, আর মনে করোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক। এমন একটা পরিস্তিতিতে ক্লাস!

একদিকে সারাদেশ এবং বিশ্বের মানুষ যেখানে তাদের জীবন কিভাবে বাঁচাবে সেটা নিয়ে নিয়ে উদ্বিগ্ন। সেখানে আমাদের উপর অধিকাংশ শিক্ষার্থীর অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনলাইন ক্লাস চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। হ্যাঁ, যদিও এটা আমাদের ভালোর জন্য, আমাদের সেশনজট থেকে মুক্ত রাখার জন্য করা হয়েছে৷ কিন্তু আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, ইন্টারনেটের স্পিড, ডিভাইসের দূষ্প্রাপ্যতা , মানবিক দিক সবই তো ভাবতে হবে। যেখানে যথেষ্ট ইচ্ছা থাকার পরেও অনেক শিক্ষার্থী অনলাইনে ক্লাসে কানেক্টেড হতে পারছে নাহ, অনেকে ক্লাসে কানেক্টেড থেকেও পড়া বুঝতে পারতেছে নাহ, অনেক শিক্ষার্থী এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব কারণে বিশাল একটা অংশ অনলাইন ক্লাসের সুবিধা পাবেনা ও পরবর্তীতে সে যদি পুনরায় ঐ ক্লাসের সুবিধা না পায় তাহলে সেমিস্টার ড্রপ বা কোর্স ড্রপ করার সম্ভাবনা থাকে। তাই এটা ফলপ্রসূ হবে বলে মনে হয় না।

একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশীর ভাগ শিক্ষার্থী যে সিষ্টেমের বিরুদ্ধে এবং তাদের দাবীগুলো যৌক্তিক, সেই বিষয়টি কি একটিবারও বিবেচনা করে দেখা যায় নাহ? জনগণের কষ্টার্জিত ট্যাক্সের টাকায় পড়াশুনা করে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে মানবকল্যাণ মূলক কাজ না করে ঘরে বসে অনলাইনে ক্লাস করা কতটুকু যৌক্তিক বিষয় একটু ভেবে দেখবেন? ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের বেঈমান বলে ধিক্কার দিবে নাহ তার কি গ্যারান্টি স্যার? আবার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরা না পারছি মোবাইলে রিচার্জ করতে, না দ্রুতগতির ইন্টারনেট ইউজ করতে, না পারছি ক্লাসে কানেক্টেড হতে? এ দায়ভার কে নিবে? এর থেকে ভালো হয় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিন, মরলে ক্লাস করতে করতে মরে যাই? কিন্তু এই ভাবে আর পারছি নাহ।

উপরোক্ত বিষয়টি গুলো বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে যাদের স্মার্টফোন নাই তাদের ভালো মোবাইল ফোন/ ল্যাপটপের ব্যাবস্থা করে দেওয়া, যেসব এলাকায় ইন্টারনেটের স্পিড কম সেইসব এলাকায় ইন্টারনেট কানেকশনের সুবস্থা করে দিবেন এবং অবশ্যই প্রতিটি শিক্ষার্থীর মোবাইলে এমবি কেনার জন্য পর্যাপ্ত টাকা তুলে দিবেন অথবা ওয়াইফাই এর সুব্যবস্থা করবেন। আর যদি এসব ব্যবস্থা না করতে পারেন তাহলে দয়া করে মানবিক দিক এবং যৌক্তিক দিক বিচার বিবেচনা করে হলেও অনলাইন ক্লাস বন্ধ রাখুন প্লিজ...


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ