পড়তে এসে এ দেশের মাটি ও মানুষকে ভালোবেসে ফেলেছি

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী এখন দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (হাবিপ্রবি)। বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই শতাধিক বিদেশী শিক্ষার্থী পড়াশুনা করছেন। ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য্য, শিক্ষার মনোরম পরিবেশ, প্রকৃতি ও শিক্ষকদের আন্তরিকতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়তে এসেছে সুদূর নেপাল, ভুটান, ভারত, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া ও ইথিওপিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে। বিদেশি এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে বর্তমানে স্নাতক পর্যায়ে ১৪৮ জন এবং স্নাতকোত্তর ৬৫ জনের মতো শিক্ষার্থী রয়েছে।

বিদেশি এসব শিক্ষার্থী হাবিপ্রবিতে পড়তে এসে ভালোবেসে ফেলেছেন এ দেশের মাটি–মানুষ আর মুখের ভাষা। ভালবেসে অনেকেই নিজের মাতৃভাষা ও ইংরেজিতে কথা বলতে পারলেও কথা বলছেন বাংলায়। নিজের ভাষাটা জানেন, তারপরও বাংলা ভাষা শিখতে পারলে সেটাকে অনেকে গৌরবের মনে করেন। কারণ তারা শুনেছেন, ভাষার জন্য রক্ত দিতে হয়েছে বাংলাদেশিদের। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং ৩০ লাখ শহীদের বিনিময়ে বাংলাদেশিরা তাদের মাতৃভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা পেয়েছে। এজন্য তারা বাংলা ভাষায় কথা বলাকে সম্মানের মনে করেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নেপালি শিক্ষার্থীর অনেকে বাংলায় কথা বলেন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শেষবর্ষের শিক্ষার্থী নীতি লামি ছানে অত্যান্ত সাবলীলভাবে বাংলাদেশিদের সাথে কথা বলছেন বাংলায়। শুধু কথা বলাই নয় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করছেন বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে। বর্তমানে এইচএসটিমুনার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। সংগঠণ করার সুযোগে ঘুরে বেড়িয়েছেন ঢাকা, রাজশাহী, পাবনা, বেগম রোকেয়া, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব জায়গায় সংগঠনের হয়ে পেয়েছেন পুরস্কারও। শুধু এসবেই নয়, নাচ-গানেও আছে তার সরব বিচরণ ।

বাংলা কিভাবে শিখলেন সে সম্পর্কে নীতি লামে ছানে জানান, আমি আর্কিটেকচারে পড়ি। আর আর্কিটেকচার অনেক বেশি কঠিন একটা সাবজেক্ট। সহজে বুঝতে পারতাম না। আমরা আগে ৪-৫ জন শিক্ষার্থী ছিলাম। তাই যখন পড়াশোনা করতাম তখন আমরা দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থী একসাথে হয়ে পড়তাম। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে আমি বাংলা ভাষায় কথা বলা শিখি বন্ধুদের কাছ থেকে।

নীতি লামি ছানে আরও জানান, আমরা খুব ভাগ্যবান হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়ে। এখানকার সবাই খুব আন্তরিক ও সৌহাদ্যপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ্ববর্তী মানুষজনও খুব ভালো। রাস্তাঘাটে নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারি আমরা, কোন সমস্যা হয় না। শহরের কেনাকাটা করতে গেলে মাঝেমধ্যে একটু সমস্যা হয়, তারা ভিনদেশি বুঝতে পেরে অনেক সময় জিনিসের দাম কিছুটা বেশি রাখে। তবে স্থানীয়রা এটা করে না।

নিতী লামি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিকে আরও জানার জন্য জাতীয় সকল অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করেন বলে জানান। শহীদ দিবস, বুদ্ধিজীবী দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, শোক দিবসের অনুষ্ঠানগুলোতেও অংশ নেয়। এছাড়া থাকে ভিনদেশি অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও। কথা বলতে গিয়ে বারবার তিনি দিনাজপুরের মানুষদের ‘ভালো মানুষ’ বলে আখ্যায়িত করেন।

নীতি লামের কাছে নিজেদের স্বদেশী ভাষায় দিনাজপুরের লোক কেমন জানতে চাইলে বলেন, ‘দিনাজপুর কো মানসে অসল।’

কৃষি অনুষদের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী দীপকের কাছ থেকে বাংলাদেশী কয়েকটি বাক্যের নেপালি শব্দ জানতে চাওয়া হয়। সেও অত্যান্ত সাবলীলভাবে সেগুলোর বাংলা বলে দেয়। বাংলা এত দ্রুত কিভাবে শিখলো সে সম্পর্কে সে জানায়, আমাদের একটা মৈতালি নামে ভাষা আছে যার সাথে প্রায় ৫০ ভাগ বাংলা ভাষার মিল রয়েছে। যে কারণে আমরা সহজেই বাংলা বুঝতে পারি এবং বলতে পারছি। আর এখানে তো সবাই বাংলা বলে তাই আরও সহজ হয়ে গেছে। তার কাছে জানতে চাওয়া হয় ভার্সিটি কেমন লাগে এর নেপালি কি? সে বলে ভার্সিটি রামরোসা। এইভাবে তাকে আপনার নাম কি এর নেপালি বলেন, তিমরো নাম কে হো? আপনি কোথা থেকে এসেছেন এর নেপালি তিমি কাহা দেখি আয়ে কো হো? আপনি কেমন আছেন এর নেপালি হচ্ছে তিমি কাছতে ছো?

তাদের দুজনের একাডেমিক রেজাল্টও বেশ ভালো। এখন পর্যন্ত ৩.৫০ এর ওপরে রয়েছে তাদের রেজাল্ট। ভবিষ্যতে এখানে চাকরির সুযোগ হলে করবেন কিনা তা জানতে চাইলে জানায়, আমাদের দেশ থেকে বাংলাদেশে চাকরির বেতন কম। তাছাড়া আমাদের নিজেদের একটা সংস্কৃতি আছে সেটা ছাড়া এখানে দীর্ঘদিন থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব না।


মন্তব্য