এমপিওভুক্তির বিষয়ে যা হলো সংসদে

নতুন করে এমপিওভুক্তির কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল অসুস্থ থাকায় বাজেটের এই অংশটি পড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দীর্ঘ প্রায় নয় বছর বন্ধ থাকার পর আবার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হচ্ছে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সংক্রান্ত অংশের বাজেট বক্তৃতার শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি সুসংবাদ দিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আমি প্রথমে আলোকপাত করতে চাই। দীর্ঘদিন আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নানাবিধ কারণে এমপিওভুক্তি কার্যক্রমটি বন্ধ ছিল। এবারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এমপিওভুক্তি কার্যক্রমের জন্য এ বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান রাখা হয়েছে।

এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রতি মাসে বেতন-ভাতা বাবদ সরকারি অংশ (মূল বেতন ও কিছু ভাতা) পেয়ে থাকেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, খুব শিগগির নতুন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ঘোষণা দেওয়া হবে। তবে তা কার্যকর হবে আগামী ১ জুলাই থেকে। এখন শেষ পর্যায়ের যাচাই-বাছাই চলছে। 

এ ছাড়াও বাজেট বক্তৃতায় মানসম্মত শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, বর্তমানে ২৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ (মূলত শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়) শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। আগামী অর্থবছরে এ বাবদ বরাদ্দ মোট বাজেটের ১৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।

 এ মাসেই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ঘোষণা দেবে সরকার। এজন্য চলতি বাজেটে ‌‌‘এমপিও খাতের বরাদ্দ’ রাখা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলেও বাজেট ঘোষণার এক সপ্তাহ পর এমপিওপ্রাপ্ত চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করা হবে। এক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ পাচ্ছে নারী শিক্ষায় অবদান রাখছে এমন প্রতিষ্ঠান। এরপর চরাঞ্চল, হাওর, পাহাড়ি, পার্বত্য অঞ্চলসহ দুর্গম অঞ্চলের প্রতিষ্ঠান পাবে এ বিশেষ সুযোগ। তবে তার জন্য লাগবে স্থানীয় সংসদ সদস্যের আধাসরকারি পত্র (ডিও লেটার)। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমপিওভুক্তির জন্য গঠিত কমিটির একাধিক সদস্য এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমপিওভুক্ত শাখার কর্মকর্তারা জানান, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য নারী ও দুর্গম প্রতিষ্ঠানের ক্যাটেগরিতে ডিও লেটার দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) মহাপরিচালক মো. ফসিউল্লাহ বলেন, এখন যে তালিকা হয়েছে তা অনলাইনের মাধ্যমে হয়েছে। এগুলো আরও যাচাই-বাছাই করতে আজ দুপুর ২টায় তারা বৈঠকে বসছেন। তিনি বলেন, তিন ক্যাটাগরি তথা নারী, অবহেলিত ও দুর্গম এলাকাগুলোর প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ বিবেচনায় আনা হচ্ছে। সেই তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির তালিকা চূড়ান্ত করে তা মন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রীর অনুমোদনের পর এ মাসের মধ্যেই এমপিওভুক্তির ঘোষণা দেয়া হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, এমপিওভুক্তির দাবিতে গত বছরের জুন মাসে সারা দেশের ননএমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার শিক্ষক-কর্মচারী জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আমরণ কর্মসূচি পালন করেন। নির্বাচন সামনে রেখে শিক্ষক আন্দোলন থামাতে সরকারের পক্ষ থেকে এমপিওভুক্তির আশ্বাস দেয়া হয়। গত বছরের ২০ জুন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির কাজের জন্য একটি বাছাই কমিটি এবং অনলাইনে আবেদন গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য আরেকটি কারিগরি কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক) জাবেদ আহমেদের নেতৃত্বে গঠন করা হয় নয় সদস্যের ‘প্রতিষ্ঠান বাছাই কমিটি’। কমিটির অপর সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) মহাপরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক), যুগ্ম সচিব (আইন), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক), পরিচালক (কলেজ), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উপসচিব (কলেজ), জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব (বাজেট)। কমিটির সদস্যসচিব করা হয় যুগ্ম সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক-৩)। অন্যদিকে অনলাইনে আবেদন গ্রহণের জন্য ব্যানবেইস’র মহাপরিচালক মো. ফসিউল্লাহর নেতৃত্বে গঠন করা হয় আট সদস্যের কারিগরি কমিটি। এই কমিটিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সিস্টেম অ্যানালিস্ট, প্রোগ্রামারসহ বিশেষজ্ঞদের কমিটির সদস্য করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমপিওভুক্তির ঘোষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আবেদন নেয়। গত বছরের ৫ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদন নেয়া হয়। এই কমিটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রস্তুত করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরে গ্রেডেশন তালিকা 'প্রতিষ্ঠান বাছাই কমিটির' কাছে উপস্থাপন করে। বাছাই কমিটি কয়েক দফা সভা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরে গ্রেডেশন তালিকা যাচাই-বাছাই করেছে।

আবেদনের যোগ্যতা হিসেবে ১০০ নম্বর নির্ধারণ করা হয়। প্রতিষ্ঠানের বয়স, শিক্ষার্থী সংক্রান্ত তথ্য, পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও পাসের হার, অবকাঠামো ইত্যাদি বিবেচনায় নম্বর দেয়া হয়। সারা দেশের সাড়ে সাত হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র দুই হাজার প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন করে। এরমধ্যে স্কুল-কলেজ প্রায় ১২শ', মাদ্রাসা ৫শ' এবং সাড়ে ৩শ' কারিগরি প্রতিষ্ঠান। কাটছাঁট করে বর্তমানে ১৫২৯টি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কর্মকর্তারা জানান, এমপিও পায় না এমন সাধারণ স্কুল ও কলেজ আছে সারা দেশে ৭ হাজার ১৪২টি। তবে এমপিওর জন্য অনলাইনে আবেদন করেছে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার। মাউশির এক হিসাবে দেখা গেছে, ৭ হাজার ১৪২টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে বার্ষিক দুই হাজার ১৮৪ কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার ২৫০ টাকা দরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো মাউশির এক হিসাবে বলা হয়েছে, প্রতিটি ডিগ্রি কলেজ এমপিওভুক্ত করতে বছরে লাগে ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫০ টাকা; উচ্চমাধ্যমিক কলেজে ৬৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকা, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩৩ লাখ ৮০ হাজার, আর নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে লাগে ১৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতোই মাদ্রাসাগুলোতে অর্থের প্রয়োজন।


মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে ২৬ হাজার ১৮০টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত আছে। এর মধ্যে স্কুল ১৬ হাজার ১৯৭টি, কলেজ দুই হাজার ৩৬৫টি, মাদ্রাসা সাত হাজার ৬১৮টি। এ খাতে সরকারের ব্যয় বরাদ্দ আছে বছরে ১৪ হাজার ১৮২ কোটি টাকা। এ ব্যয় বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেটের ৬৩ শতাংশের বেশি। আবেদনকৃত প্রতিষ্ঠানকে এমপিও দিলে বছরে অন্তত আরও তিন হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। আগামী অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি ও সরকারীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা ব্যয় মেটাতে অতিরিক্ত চার হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি এ বিষয়ে অর্থ সচিবকে একটি আধাসরকারি পত্র দিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব।

২০১০ সালে এক হাজার ৬২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়। তখনই অনেক প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে। এরপর থেকে এমপিওভুক্তির ননএমপি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা আন্দোলন করে আসছেন।

 

 


মন্তব্য