০৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:২৭

সেই গানের স্কুলের ছেলেটি আজ স্বপ্নের নির্বাহী

অনেক ইতিহাসকে পিছনে ফেলে সুপারশপ স্বপ্নের নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির। একসময়ের বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) এর ছাত্র ছিলেন তিনি। মা আশরাফুন নেসা গায়িকা। তাঁর কল্যাণে ছোটবেলায় গানে হাতেখড়ি। শৈশবেই গান শিখতে ভর্তি হলেন খুলনার একটি গানের স্কুলে, নাম ছিল স্কুল অব মিউজিক। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সাধারণ পড়াশোনাও সেই গানের স্কুলেই চলল। তারপর ভর্তি হন খুলনারই সেন্ট যোসেফ স্কুলে। দশম শ্রেণিতে থাকতেই বন্ধুদের নিয়ে গঠন করলেন ব্যান্ড দল, নাম নাইট এঙ্গেল। কলেজ শেষ করেই বুয়েটে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।

তবে মা আশরাফুন নেসা গায়িকা থাকায় গানের নেশা তাঁকেও ছাড়েনি। সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্ম। শাস্ত্রীয় সংগীত শিখতে হতো। তাই বর্ণ শেখার আগেই গান শিখেছে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় হাতে গিটার আসে তার হাতে। ১৯৯৮ সালে প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের পর দীর্ঘ বিরতি যায় গানে। ২০১৮ সালে আবার গান শুরু। ব্ল্যাকমুন নামে নতুন ব্যান্ডদল যোগ তৈরি করা হয়। তবে মাঝের ২০ বছরে নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলেছেন। গানের স্কুলে পড়া সেই ছেলেটি

সুপারশপ স্বপ্নের নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির। গান-অ্যালবাম, বুয়েটে পড়াশোনার সঙ্গে যোগ না থাকলেও এসিআই লজিস্টিকসের এই প্রতিষ্ঠানকে ২০১২ সাল থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নিত্যনতুন ব্যবসায়িক ধরন বা মডেল দিয়ে তিনি স্বপ্নকে দেশের শীর্ষস্থানীয় সুপারশপ ব্র্যান্ডে পরিণত করেছেন। সাব্বির হাসান যখন যোগ দেন তখন স্বপ্ন ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকার কোম্পানি। এখন তা হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

গত বৃহস্পতিবার সাব্বির হাসান তাঁর ছোটবেলার কথা জানান, ব্যান্ডদল, বুয়েটের শিক্ষাজীবন, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি, লন্ডনে নিজের ব্যবসা, তারপর স্বপ্নের নির্বাহী পরিচালক, ব্যক্তিজীবনসহ নানা বিষয়ে বলেন। তাঁর কথা তাঁর মুখেই শুনুন।

সাব্বির হাসান বলেন, তিনি কখনো ভাবেননি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হতে হবে। তিনি আসলে কাজ শিখতে চেয়েছেন। প্রস্তুতির জন্য ১৯৯৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসনে এমবিএতে ভর্তি হলেন। ২০০২ সালে এমবিএ শেষ হলো। বেশ কিছু চাকরির প্রস্তাব পেলেন। বাটার ঢাকা বিভাগের পাইকারি বিক্রির প্রধানের দায়িত্ব ছেড়ে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এন্টারপ্রাইজে যোগ দিলেন। পদ মহাব্যবস্থাপক। কাজ ছিল সারা দেশে আর্সেনিক দূর করার ফিল্টার সরবরাহ। পরের বছর নতুন চাকরি নিয়ে আফ্রিকার অ্যাঙ্গোলায় চলে গেলেন। তত দিনে বিয়ে করেছেন। সন্তানের পিতা হয়েছেন সাব্বির হাসান।

অ্যাঙ্গোলায় ইউনিলিভার, নেসলে ও ক্র্যাফটস যৌথভাবে একটি লাইসেন্সের মাধ্যমে তাদের পণ্য বিক্রি করত। সেখানে কারখানাও ছিল। সাব্বির হাসান বিপণন ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগ দেন। তবে পর্তুগিজ ভাষা না জানার কারণে উৎপাদন ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু পরিবারকে ছেড়ে বিদেশে মন টিকছিল না। ছুটিতে এসে আর ফেরেননি।


দেশে ফিরে যোগ দেন ডেকো গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক পদে। তারপর ট্রেটাপেক নামে সুইডিশ কোম্পানিতে। হঠাৎ একদিন আসবাব ব্র্যান্ড অটবির প্রতিষ্ঠাতা নিতুন কুন্ডুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। কথাবার্তার পর তিনি (নিতুন কুন্ডু) বললেন অটবিতে যোগ দিতে। সাব্বির হাসান বলেন, ‘আমি না করলাম। তবে দাদাকে আমার বেশ পছন্দ হলো। পরদিন দাদা অটবির মানবসম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তাকে দিয়ে ব্ল্যাঙ্ক চেক (টাকার অঙ্ক না লেখা) পাঠালেন। কর্মকর্তা বললেন, “বেতনের অঙ্ক আপনি নিজের মতো করে লিখে নেন।” আমি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলাম। তবে বললাম, অটবিকে সহায়তা করব। চাকরি পাশাপাশি শুক্র ও শনিবার দাদার বাসায় বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিই।’

সেই অটবিতেই সাব্বির হাসান নাসির যোগ দেন। কীভাবে সেই গল্পও বললেন। তিনি বলেন, ‘২০০৬ সালের দিকে নিতুন কুন্ডু আবার বললেন অটবিতে যোগ দিতে। আমি বললাম, আপনার প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি ও কাঠামোর সঙ্গে আমি মানাতে পারব না। দাদা বলেন “সংস্কৃতি আমি করে দিচ্ছি। তুমি যোগ দেও।” তখনো আমি তাকে ফিরিয়ে দিলাম। কিন্তু কিছুদিন পর তিনি আবার এলেন। তখন আমার মনে হলো, দাদার সঙ্গে আমার থাকতে হবে। আমি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে অটবিতে যোগ দিলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমি দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাস পরই দাদা পরলোকগমন করলেন।’

নিতুন কুন্ডু মারা যাওয়ার পর অটবিতে তখন কঠিন সময়। কর্মীরা সব ভেঙে পড়েছেন। সাব্বির হাসান বলেন, ‘আমরা কর্মীদের মধ্যে উদ্দীপনা ফিরিয়ে আনলাম। দাদার ছেলে অনিমেষ কুন্ডু ও মেয়ে অমিতি কুন্ডুর সহায়তায় বছর পাঁচেকের মধ্যে ১০০ কোটি টাকার অটবি সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার কোম্পানিতে পরিণত হলো। অটবি একটি আঞ্চলিক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়ে গেল।’

একটি কারণে ২০১১ সালে অটবি ছেড়ে দেন সাব্বির হাসান। পরিবার নিয়ে চলে যান লন্ডনে। সেখানে গিয়ে নিজেই রোডম্যাপ নামের পরামর্শক কোম্পানি করেন। বাংলাদেশেও শাখা খোলা হলো। তখন যোগাযোগ হয় এসিআইয়ের সঙ্গে। শুরুতে কিছুদিন পরামর্শক হিসেবে কাজ করার পর ২০১২ সালে স্বপ্নের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন।


স্বপ্নতে যোগ দিয়ে সাব্বির হাসান দুর্নীতিবাজ কর্মীদের বিদায় করেন। স্বপ্নের স্টোরের অবস্থা তখন খুব একটা ভালো ছিল না। ক্রেতা কম ছিল। অনেকের অভিযোগ ছিল, স্বপ্ন নোংরা। সাব্বির হাসান বলেন, ‘আমি শুরুতেই কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিলাম—কীভাবে ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করা যায়। তারপর স্বপ্নে কেন মানুষ আসবে, সেদিকে নজর দিলাম। মানুষের মধ্যে একটা ধারণা ছিল, সুপারশপ মানেই দাম বেশি। আমি এ ধারণা ভেঙে দিতে কাজ করতে শুরু করলাম। তারপর ক্রেতা বাড়তে শুরু করল। তাঁরা বলতেন, স্বপ্নের পণ্য ততটা তাজা মনে হয় না। সেটির সমাধান করা হলো।’

ক্রেতাদের কিছুটা স্বস্তি ও কৃষকদের ন্যায্য দাম দেওয়ার জন্য স্বপ্ন সরাসরি প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত নিল। এতে পণ্যের দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হলো। কৃষকেরাও খুশি হলেন। ধীরে ধীরে স্বপ্নের বাজার হিস্যাও বাড়ল। বর্তমানে সুপারশপের মধ্যে স্বপ্নের পণ্য বিক্রির পরিমাণ ও শাখা সবচেয়ে বেশি।

স্বপ্নের নতুন কৌশল স্বপ্ন এক্সপ্রেস। সাব্বির হাসান বলেন, ‘উচ্চ সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে নিজস্ব স্টোরের মাধ্যমে মুনাফা করা খুবই কষ্টসাধ্য। তাই আমরা অংশীদারত্বের মাধ্যমে কিছুটা ছোট পরিসরে স্বপ্ন এক্সপ্রেস চালু করলাম। পণ্য সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা আমাদের হাতে। তবে মুনাফা ভাগাভাগি হয় অংশীদারদের সঙ্গে। বর্তমানে স্বপ্নের চেয়ে স্বপ্ন এক্সপ্রেসের স্টোর বেশি। স্বপ্নের স্টোর ৬১টি, স্বপ্ন এক্সপ্রেসের ৬৯টি।’


তিনটি। বিয়ে করা, আইবিএতে এমবিএ করা ও অটবিতে যোগ দেওয়া। তিনি বলেন, ‘বিয়ের পর যখন প্রথম সন্তান হলো, তখন আমার মনে হয়েছে টাকা দরকার। ব্যবসা ছাড়া এটি সম্ভব না। তার আগে আমি উদাসীন একটা মানুষ ছিলাম।’ তিনি আরও যোগ করেন, অটবিতে প্রধান নির্বাহী হিসেবে যোগ দিয়ে ৭ হাজার কর্মীর দুর্দান্ত এক প্রতিষ্ঠান চালানোর অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেই প্রতিষ্ঠানের রূপান্তরও তিনি কাছ থেকে দেখে অনেক কিছু শিখেছেন।


সাব্বির হাসানের স্ত্রী সুমাইয়া হাশিম। তাঁদের প্রথম পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে। স্ত্রী পেশায় আইনজীবী। দুই ছেলে— আর্য নীল ও অনিরুদ্ধ ঋককে নিয়ে তাঁদের সংসার।


সকালে ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে অফিসে আসি। সপ্তাহের ৩ দিন ৯টায় অফিসে ঢুকি। ২ দিন ১০টায়। তারপর ব্যবসার অবস্থা পর্যালোচনা করি। চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ও সফলতা নিয়েও কথা হয়। বেলা ১১টা থেকে অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক হয়। মাঝেমধ্যে স্বপ্নের স্টোর পরিদর্শনে যাই। আবার যেসব গ্রাম থেকে আমরা সরাসরি পণ্য এনে থাকি সেখানেও যাই। তবে যেদিন গ্রামে যাই সেদিন আর অফিসে আসা হয় না। অফিস শেষে বিকেলে মিউজিক স্টুডিওতে যাই। রিহার্সাল করি। রাত ১০-১১টায় বাসা ফিরি।


বাস্তব জীবনটা জানতে হবে। সে জন্য মানুষের সঙ্গে মেশা খুব জরুরি। রাস্তাঘাটে চলতে হবে। কৃষক ও শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সমস্যা শুনতে হবে। প্রতিটি বিষয়ের গভীরে গিয়ে শেখার মানসিকতা লাগবে। প্রতিদিন নতুন নতুন জিনিস শেখার আগ্রহ থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নেতৃত্বগুণ একদিনে হয় না। ভালো বা দক্ষ নেতৃত্বকে অনুসরণ করতে হবে। তা ছাড়া ভবিষ্যতের নেতাদের অবশ্যই তথ্যপ্রযুক্তি বুঝতে হবে। প্রোগ্রামিং জানতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা লাগবে।