০২ জুলাই ২০২০, ১৯:১২

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মকথা

  © টিডিসি ফটো

দেশের প্রাচীনতম, সর্ববৃহৎ এবং উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন। ৯৯ বছর আগে ১৯২১ সালের এই দিনে ঐতিহ্যবাহী এ বিশ্ববিদ্যালটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা হয়েছিল। শতবর্ষের দ্বারে দন্ডায়মান ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ নামে খ্যাত আমাদের এ প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়। ২০২১ সালের ১ জুলাই জাতি উদযাপন করবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার শতবাষির্কী। এ বছরই উদযাপিত হবে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীও।

শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম ও প্রতিষ্ঠা কোনো অনালোচিত বিষয় নয়। এ বিষয়ে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এম এ রহিম রচনা করেছেন The history of The Dacca University (পুণর্মুদ্রণ ২০১৩) নামে একটি গ্রন্থ। এতদপ্রসঙ্গে অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে সৈয়দ আবুল মকসুদ রচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা (২০১৬), অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম কর্তৃক জ্ঞানতাপস জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সাথে আলাপচারিতার ভিত্তিতে রচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ (২০০০), অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম রচিত স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (২০১৬) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশি বছর, রতনলাল চক্রবর্তী রচিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৪৭-১৯৭১), ২ খণ্ড (২০১৫), শেখ মাসুম কামাল রচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে রাজনীতি ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ, অধ্যাপক আয়শা বেগম রচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্মৃতি নিদর্শন (২০১৪), সৈয়দ রেজাউর রহমান রচিত গৌরবোজ্জ্বল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (২০০১) এবং মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম রচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এলাকার ইতিহাস (২০১৪) ইত্যাদি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণমূলক লেখা সম্বলিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালমনাই অ্যাসোসিয়শন কর্তৃক ২০১০ সালে সৌরভে গৌরবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামে ২ খণ্ডের যে পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে এ প্রসঙ্গে এটিও একটি উল্লেখযোগ্য রচনা। এছাড়াও পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকী এবং বাংলার ইতিহাস বিষয়ে রচিত বিভিন্ন গ্রন্থেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও এর অগ্রযাত্রা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে এতসব তথ্যসূত্র থাকা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মকথা নিয়ে কেন এ নিবন্ধ রচনার প্রয়াস? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের আলোর বাতিঘর। শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও এর বিকাশ নয়, বরং আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পূর্ববঙ্গে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশসহ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কেন্দ্র হিসেবেও এর রয়েছে ঐতিহাসিক ভূমিকা। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি ইতিবাচক অর্জনে নেতৃত্ব দানের গৌরবময় কৃতিত্বের অধিকারী বিদ্যাপীঠ আমাদের প্রিয় এ বিশ্ববিদ্যালয়। এর জন্ম ও বিকাশের সম্পর্কে যত বেশি আলোচনা ও চর্চা হবে ততই জাতির জন্য মঙ্গল।

বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যদের তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা ও অগ্রযাত্রা সম্পর্কে পূর্বাপর বস্তুনিষ্ঠ তথ্যাদি জানা অতীব জরুরি। কিন্তু পরিধিবহুল ও তথ্যসমৃদ্ধ অনেক গ্রন্থ থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে আগ্রহের অভাবে অনেকেই এ জানার পথ মারাতে চান না। আমি মনে করি একজন শিক্ষকতো বটেই একজন শিক্ষার্থীরও তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশকালেই এর ইতিহাস সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়। নিজের প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস না জানলে, সে প্রতিষ্ঠানের অর্জন নিয়ে গর্ব করবে কিভাবে? তাছাড়া পূর্বসূরিদের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবেই বা কি করে? এসব ভাবনা থেকেই আমার এ নিবন্ধ রচনার প্রয়াস। যাতে শিক্ষার্থী ও সাধরণ পাঠকগণ স্বল্প পরিসর আলোচনা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার কথা জানতে পারে। নিবন্ধটির কলেবর বিবেচনা করে এটি দু’পর্বে প্রকাশ করা হলো। নিচে প্রথম পর্বটি তুলে ধরা হল—

এক.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এটি পূর্ববঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের ফসল। আর এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করতে হয়েছিল একদল উদ্যোমী মানুষকে। এর পুরোভাগে ছিলেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ। কিন্তু ১৯১৫ সালে নবাব সলিমুল্লাহের আকস্মিক মৃত্যু হলে নবাব সৈয়দ নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী শক্ত হাতে এই উদ্যোগের হাল ধরেন। এ কাজে তাঁর পাশে দাঁড়ান শেরে বাংলা একে ফজলুল হকসহ আরও কিছু মানুষ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে বঙ্গভঙ্গ রদের রাজকীয় ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমরা জানি যে, ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জনের (১৮৫৯-১৯২৫) দায়িত্ব পালনকালে ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়। মুসলিম সংখ্যাগুরু অঞ্চল নিয়ে ঢাকাকে রাজধানী করে “পূর্ববঙ্গ ও আসাম” নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। লর্ড কার্জনের এ পদক্ষেপ “বঙ্গভঙ্গ” নামে পরিচিত। এ বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে বাঙালি সমাজে পরস্পর বিরোধী এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

কলকাতা কেন্দ্রিক বর্ণ হিন্দু ও “ভদ্রলোক” নামে খ্যাত মধ্যবিত্ত পেশাজীবী হিন্দু সমাজ বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু করে। স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনের পথধরে এ আন্দোলন উগ্র সাম্প্রদায়িক ও সহিংস রূপ ধারন করে। অখণ্ড বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ও কংগ্রেসের রাজনীতির সাথে যুক্ত স্বল্পসংখ্যক মুসলমান বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দ্বিখণ্ডিতকরণে ব্রিটিশ রাজনৈতিক দূরভিসন্ধী নস্যাত এ আন্দোলনের দৃশ্যমান কারণ হলেও এর পেছনে ধর্মীয় ভাবাবেগ ও পেশাগত স্বার্থ জড়িত ছিল। অন্যদিকে মুসলমান সমাজ বঙ্গভঙ্গ ও নতুন প্রদেশ গঠনের মধ্যে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখে একে রক্ষার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ পূর্ব বাংলার মুসলমান সমাজকে সংগঠিত করে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন মোকাবিলার চেষ্টা করেন। তবে তাঁদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও নতুন প্রদেশ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। উগ্র সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসী আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সরকার শেষপর্যন্ত তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর সম্রাট পঞ্চম জর্জ (১৮৬৫-১৯৩৬) দিল্লি দরবার থেকে বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেন। ফলে দুই বাংলা আবার একত্রিত হয়। ভাষাতাত্ত্বিক এক নতুন বিভক্তির মাধ্যমে হিন্দি, ওড়িয়া এবং অসমিয়া অঞ্চলগুলো বঙ্গ হতে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় ন্যস্ত করা হয়। একই সাথে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর করা হয়।

বঙ্গভঙ্গ রদের প্রতিক্রিয়াও ছিল মিশ্র। হিন্দুসমাজ ও কংগ্রেস সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। উগ্রপন্থী হিন্দুরা একে হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিজয় হিসেবে প্রচার করে। অন্যদিকে এ সিদ্ধান্তে মুসলমানসমাজ প্রচণ্ড হতাশা ব্যক্ত করে। বঙ্গভঙ্গ ও নতুন প্রদেশ সৃষ্টির ফলে মাত্র ছয় বছরে পূর্ব বাংলায় যে উন্নয়নের ধারা সূচিত হয়েছিল এর ভবিষ্যৎ নিয়ে মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। নবাব সলিমুল্লাহ ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ এনে বলেন, “বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে আমরা যে সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলাম তা আমাদের বিরাট দুঃখের কারণ। কিন্তু আমাদের দুঃখ আরো বেশি তীব্র হয়ে ওঠে যখন দেখি সরকার আমাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করে বা কোনো পূর্বাভাষ না দিয়েই এই পরিবর্তন বাস্তবায়ন করলেন।” ১৯১২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি House of Lords- এ লর্ড কার্জনের প্রদত্ত ভাষণ থেকেও সেময়কার বাঙালি মুসলমানদের মার্মান্তিক অনুভূতির একটি চিত্র পাওয়া যায়।

বঙ্গভঙ্গ রদের প্রতিক্রিয়ায় পূর্ব বাংলা তথা মুসলিমদের অসন্তোষ ব্রিটিশ সরকারের জন্য আরেক নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ (১৮৫৮-১৯৪৪) ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকা সফরে আসলে নবাব সলিমুল্লাহ নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ও একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে একটি মুসলিম প্রতিনিধি দল তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। অন্যান্য দাবির সাথে তাঁরা পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানান। এ দাবির পেছনে কারণ ছিল যে, ইতোমধ্যে মুসলিমসমাজের নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন প্রতিবেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের তুলনায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তাদের পশ্চাৎপদতার অন্যতম কারণ হলো শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের অনগ্ররসরতা।

তাই নতুন পরিস্থিতিতে অর্জিত শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য তাঁরা ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। লর্ড হাডিঞ্জ মুসলিম নেতাদের এ দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করেন। কারণ ১৯০৫-১১ সাল পর্যন্ত নতুন প্রদেশে পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা শিক্ষা ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি অর্জন করেছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকারের কাছেও প্রতীয়মান হয়েছিল যে, পূর্ববঙ্গে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি না করা হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের অগ্রগতির হার ও প্রকর্ষ অব্যাহত রাখা যাবে না। লর্ড হাডিঞ্জ মুসলিম নেতাদের আশ্বস্ত করেন যে, তিনি ঢাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পূর্ববঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির জন্য প্রয়োজনে একজন বিশেষ কর্মকর্তা নিয়োগের ব্যাপারে ভারত সচিবের (Secretary of State for India) এর কাছে সুপারিশ করবেন।

দুই.
ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সরকার সিদ্ধান্ত নিলেও এর বাস্তবায়ন সহজ ছিল না। সরকারের এ সিদ্ধান্ত তদানিন্তন বাঙালি হিন্দু বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদদের অনেকের এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মনঃপুত হয়নি। তাই তাঁরা এ সরকারি সিদ্ধান্ত বানচালের জন্য প্রতিবাদমূখর হয়ে ওঠেন। কলকাতা কেন্দ্রিক সংবাদ পত্রেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করা হয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, পশ্চিমা ধাঁচের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভারতবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের (সিপাহী বিদ্রোহ নামে সমাধিক পরিচিত) পর। ১৮৫৭ সালে ভারতের বড়লাট লর্ড ক্যানিং (১৮১২-১৮৬২) University Act, 1857 (আইনটির অফিসিয়াল নাম ছিল The University Act No II of 1857) বলে কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বেতে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

মুসলমানদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চতুর্থ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারি ঘোষণা দেয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণায় মুসলমানরা আনন্দিত হলেও বাংলার বিশেষ করে কলকাতার হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও বুদ্ধিজীবী সমাজ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ১৬ ফেব্রুয়ারি ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে সাক্ষাৎ করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। তাঁর সাথে এ প্রতিনিধি দলে ছিলেন রাজা পেয়ারী মোহন মুখোপাধ্যায়, বাবু ভুপেন্দ্রনাথ বসু, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, অম্বিকাচরণ মজুমদার, কিশোরী মোহন চৌধুরী, দ্বারাকানাথ চক্রবর্তী এবং যাত্রামোহন সেন। প্রতিনিধি দলে একমাত্র মুসলিম সদস্য ছিলেন ব্যারিস্টার আবদুর রসুল।

উল্লেখ্য যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতাকারীদের মধ্যে যেসব বাঙালি মুসলমান যুক্ত ছিলেন, তাঁদের প্রায় সকলেই ছিলেন কংগ্রেসের রাজনীতির সাথে যুক্ত। যা’হোক এ প্রতিনিধি দলের প্রদত্ত স্মারকলিপিতে এ আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় যে, ঢাকায় একটি পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বস্তুত বাংলাকে “অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্তির”(an internal Partition of Bengal) শামিল হবে। তাঁরা আরও মত প্রকাশ করেন যে, পূর্ববাংলার মুসলিম সম্প্রদায় বেশির ভাগই কৃষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাদের কোনো উপকার হবে না। স্মারকলিপিতে পূর্ববঙ্গের শিক্ষার উন্নতির বিষয়টি তদারকির জন্য একজন বিশেষ কর্মকর্তা নিয়োগের সরকারি সদিচ্ছারও বিরোধিতা করা হয়। তাঁদের মতে, এটি শিক্ষার ক্ষেত্রে বিভাজন তৈরি করবে এবং বাংলায় অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্নতাকে আরও ত্বরান্বিত করবে। লর্ড হাডিঞ্জ প্রতিনিধি দলের বক্তব্য শোনার পর বলেছিলেন যে, বিগত কয়েক বছরে পূর্ববঙ্গে শিক্ষার যে অগ্রগতির ধারা সূচিত হয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অতীব জরুরি। লর্ড হার্ডিঞ্জ প্রতিনিধিদলকে আশ্বস্ত করেন যে, বাংলাকে পুনরায় বিভক্ত করার কোনো পদক্ষেপ সরকার কর্তৃক গৃহীত হবে না। তিনি আরও বলেন যে, এ নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হবে আবাসিক এবং তা ধর্ম-বর্ণ সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার এখানেই শেষ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কলকাতার বিডন স্কয়ারে একটি প্রতিবাদ সভা হয়েছিল। এতে সভাপতির ভাষণে সুরেশচন্দ্র সমাজপতি বলেছিলেন, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে বাঙালি জাতি বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং এর ফলে বাঙালির অবস্থা পূর্বেকার বঙ্গবিভাগ হতে শোচনীয় ও ক্ষতিকর হবে। ১২ মার্চ কলকাতা টাউন হল মাঠে ব্যারিস্টার ব্যোমকেশ চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভাতে অশিক্ষিত ও কৃষকবহুল পূর্ববঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সভায় বলায় হয় যে, এর ফরে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিম বাংলার শিক্ষানীতি ও মেধার মধ্যে কোনো সামঞ্জস্যই থাকবে না। এ সভায় বিপিনচন্দ্রপাল ও ব্যারিস্টার আবদুর রসুল প্রমুখও বক্তৃতা করেছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে নেমেছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসও। কংগ্রেসের বাঙালি নেতৃত্ব চাষাভূষা অধ্যুসিত পূর্ববঙ্গের ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে অপ্রয়োজনীয় উদ্যোগ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। এমনকি এ বাবদ সরকারি অর্থ ব্যয়কে তাঁরা “অর্থের অপচয়” বলতেও দ্বিধা করেননি। তাঁরা মনে করতেন, কৃষক সন্তানদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা অপেক্ষা কৃষিকাজ, ক্ষেতখামার চাষ করার পদ্ধতি ও লাঙ্গলের ফলা তৈরি বিদ্যা শিক্ষা বেশি উপকারি হবে। এজন্য ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং একটি টেকনিক্যাল স্কুল, একটি কৃষি বিদ্যালয় বা প্যারামেডিকেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। তারপরও যদি কেউ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চায়, তবে তার জন্য তো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আছেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে কংগ্রেসের এ অবস্থানের কারণে পূর্ববঙ্গের কংগ্রেস সমর্থকগণও নীতিগতভাবে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় নেমেছিলেন। পূর্ববঙ্গে “পিপলস অ্যাসোসিয়েশন” নামে কংগ্রেস সমর্থক যে বড় সামাজিক সংগঠনটি ছিল সেটি শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করতে থাকে।

১৯১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই ঢাকা বার লাইব্রেরিতে বাবু ত্রৈলোক্যনাথ বসুর সভাপতিত্বে দু’টি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এসব সভায় বক্তারা বলেছিলেন, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষার মানের অবনতি হবে। তাই প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু ঢাকায় নয়, ফরিদপুরেও প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে সভা হয়েছিল বলে জানা যায়। নারায়ণগঞ্জের একজন বিশিষ্ট আইনজীবী ও কংগ্রেস নেতা ছিলেন শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধাচারণ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের কাছে প্রদত্ত বক্তব্যে তিনি এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে সৃষ্ট বিচ্ছিন্নতা বাংলায় বড়ধরনের রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।

ইতোমধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, কংগ্রেস সমর্থক মুসলমানরাও ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে সুনজরে দেখননি। এ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার আবদুর রসুলের কথা বলা হয়েছে। তবে এর বাইরেও ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতাকারী মুসলমানদের কথা জানা যায়। এদের মধ্যে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তরা অন্যতম। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের শিক্ষায় পশ্চাৎপদতার কথা বিবেচনায় নিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং একডিট ভাল মানের মুসলিম কলেজ প্রতিষ্ঠার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। পশ্চিম বাংলার মহামেডান এসোসিয়েশনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিল। মাওলানা মুহাম্মদ আলীও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। এমনকি মাওলানা আকরাম খাঁও পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের শিক্ষার বাস্তব পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় অপেক্ষা সেখানে স্কুল প্রতিষ্ঠাই বেশি জরুরি বলে মনে করতেন বলে তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়।

আগেই বলা হয়েছে যে, ঢাকায় প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতাকারীদের মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছিলেন অগ্রগামী। এখানে বলা প্রয়োজন যে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েরও প্রতিও পূর্ববঙ্গের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক ছিল না। সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা গ্রন্থে লিখেছেন “কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বাঙালি মুসলমানদের ক্ষোভ ছিল ১৯০৫ সালে পূর্ব বাংলা এবং আসাম প্রদেশ গঠনের অনেক আগে থেকেই। ... ক্ষোভের কারণ শুধু হিন্দু প্রাধান্য নয়, শিক্ষাক্রমে হিন্দুধর্ম প্রাধান্য পাওয়ায় মুসলমানদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।” এই রকম একটি বাস্তবতায় যখন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়, তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই এর বিরোধিতায় নামেন। তাঁদের মধ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানিন্তন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা ছিল স্পষ্ট এবং খোলামেলা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর আত্মজীবনী জীবনের স্মৃতির দীপে এবং 'ঢাকার স্মৃতি' প্রবন্ধে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করেছিলেন। ভাইসরয় স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে সম্মান করতেন। তবে এ বিষয়ে তাঁর দাবি রক্ষা করা সম্ভব ছিল না। এ অবস্থায় হার্ডিঞ্জ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, তিনি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাই তিনি সরাসরি তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলনে কিসের বিনিময়ে তিনি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা থেকে বিরত থাকবেন।

শেষ পর্যন্ত আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি নতুন প্রফেসর পদ সৃষ্টির বিনিময়ে বিরোধের অবসান ঘটান। ভাইসরয় ও আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মধ্যকার এ সমঝোতাকে The Dacca University Pact নামে অভিহিত করা হয়। এই সমঝোতার ভিত্তিতে প্রাপ্ত চারটি অধ্যাপক পদ Carmichael Professor of Ancient Indian History and Culture, Minto Professor of Economics, George V Professor of Philosophy Ges Hardinge Professor of Mathematics নামে পরিচিত ছিল।

যা’হোক এভাবেই আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মাত্র চারটি অধ্যাপক পদের বিনিময়ে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা ত্যাগ করেননি, একই সাথে তিনি যে নিজের আত্মসম্মান ও ব্যক্তিত্বের বিসর্জন দিয়েছিলেন তা বলা বাহুল্য। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগসহ অনেক কাজে সহায়তা করেছেন বটে, তবে তাঁর এ প্রারম্ভিক ভূমিকার কথা মানুষ ভুলে যায়নি। এজন্য আজও অনেকে বলে থাকেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সামান্য ঘুষ পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা ত্যাগ করেন।

এ পর্যায়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গের পর্যালোচনা দরকার। আর সেটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা বিষয়ে। এ বিষয়ে পরস্পর বিরোধী দু’টি মত পাওয়া যায়। আবুল আসাদের একশ বছরের রাজনীতি, সরকার শাহবুদ্দীন আহমেদের ইতিহাসের নিরিখে রবীন্দ্র-নজরুল চরিত এবং তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিন বীরপ্রতীক রচিত স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা ও অন্যান্য কিছু গ্রন্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় কবি রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতা করেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। একই অভিযোগ সম্বলিত কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধেরও সন্ধান পাওয়া যায়। এসব রচনার মূলসুর হলো কলাকাতার অন্যান্য হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের মতো রবীন্দ্রনাথও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে কলকাতা গড়ের মাঠে যে বিশাল প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সভাপতিত্ব করেছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরোধিতার বিষয়ে ওপরে বর্ণিত অভিযোগ তথ্যভিত্তিক ও সত্য নয় বলে অনেকেই দাবি করছেন। তাঁদের বক্তব্য মতে, যারা রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এই অভিযোগটি করছেন তারা তাদের রচনায় কোনো সূত্রের উল্লেখ করেননি। এ প্রসঙ্গে বিবিসি বাংলার সাথে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড.বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন, “কেউ কেউ কোনো প্রমাণ উপস্থিত না করেই লিখিতভাবে জানাচ্ছেন যে, ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ মার্চ কলকাতায় গড়ের মাঠে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে এক বিরাট জনসভা হয়। ও রকম একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল বটে, কিন্তু তাতে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি ছিল অসম্ভব, কেননা সেদিন তিনি কলকাতাতেই ছিলেন না। ১৯১২ সালের ১৯ মার্চ সিটি অব প্যারিস জাহাজযোগে রবীন্দ্রনাথের বিলাতযাত্রার কথা ছিল। তাঁর সফরসঙ্গী ডাক্তার দ্বিজেন্দ্রনাথ মিত্র জাহাজে উঠে পড়েছিলেন, কবির মালপত্রও তাতে তোলা হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু আকস্মিকভাবে ওইদিন সকালে রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে মাদ্রাজ থেকে তাঁর মালপত্র ফিরিয়ে আনা হয়। কলকাতায় কয়েক দিন বিশ্রাম করে ২৪ মার্চ রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে চলে আসেন এবং ২৮ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিলের মধ্যে সেখানে বসে ১৮টি গান ও কবিতা রচনা করেন।”

বিশ্বজিৎ ঘোষের বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায় কথা সাহিত্যক ও প্রাবন্ধিক কুলদা রায় ও গবেষক এম এম আর জালাল রচিত ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা ও রবীন্দ্রনাথ’ নামক এক নিবন্ধে। এতে উদ্ধৃত সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে শিলাইদহে তাঁর কুঠি বাড়িতে ছিলেন এর সমর্থনে ২৮ শে মার্চ ১৯১২ সালে শিলাইদহ থেকে তাঁর পুত্রকন্যাদের গৃহশিক্ষক ও শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্যাশ্রমের শিক্ষক জগদানন্দ রায়কে রবীন্দ্রনাথের লেখা চিঠিসহ বেশ কিছু তথ্য প্রমাণ উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রশান্তকুমার পাল রবিজীবনী গ্রন্থের ষষ্ঠ খণ্ডে লিখেছেন, শিলাইদহে বসে কবি “স্থির নয়নে তাকিয়ে আছি”সহ আরও ১৭টি কবিতা বা গান লেখেন। এর মধ্যে একটি গান “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ” রচনার তারিখ ১৪ চৈত্র, ১৩১৮ বঙ্গাব্দ। ২৬শে চৈত্র ১৩১৮ (এপ্রিল ৮, ১৯১২) বঙ্গাব্দে শিলাইদহে বসেই রচনা করেছিলেন “এবার আমায় ভাসিয়ে দিতে হবে আমার”এবং ১২ এপ্রিল ১২ তারিখে লিখছেন “এবার তোরা আমার যাবার বেলাতে” গানটি। ঐ ১২ এপ্রিল, ১৯১২ শিলাইদহ থেকে তিনি কলকাতায় রওনা হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার সংবাদাদি সে সময়কার পত্র-পত্রিকায় পাওয়া যায়। এসব সংবাদের কোথাও রবীন্দ্রনাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার তথ্য নেই।

উপর্যুক্ত তথ্য বলছে যে, ২৮ মার্চ রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় নয় শিলাইদহে ছিলেন। তাই গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধি সভায় তাঁর সভাপতিত্ব করার অভিযোগটি তথ্যভিত্তিক বলে প্রমাণিত হয় না। ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং ১৯৩৬ সালে তাঁকে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিলিট ডিগ্রি প্রদান করা হয়। তিনি যদি এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীদের মধ্যে থাকতেন তা হলে প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মধ্যেই তাঁকে বক্তৃতার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হতো না। আর কর্তৃপক্ষ আমন্ত্রণ জানালেও মুসলিম সমাজের পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদ করা হতো। কিন্তু এরূপ কোনো প্রমাণও পাওয়া যায় না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রকাশ্যত কোনো বিরোধিতা করেননি। তাঁরপরও কেন তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়? স্মর্তব্য যে, বঙ্গভঙ্গ করে পূর্ববঙ্গা ও আসাম প্রদেশ সৃষ্টিকে পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের এক বিশেষ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ স্বাগত জানিয়েছিলেন। কাজেই এর বিরোধিতাকারীদের প্রতি তাঁদের ক্ষোভ ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন সেই দলের। তদুপরি উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে তিনি ভাইসরয় কার্জনের নীতিরও কঠোর সমালোচক ছিলেন। সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা গ্রন্থে লিখেছেন “শ্রেণীস্বার্থে রবীন্দ্রনাথও ছিলেন কার্জনের ওপর অতি ক্ষুব্ধ। কার্জনের উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত মন্তব্যের তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় কলকাতার হিন্দু সমাজে। তাতে রবীন্দ্রনাথও অংশগ্রহণ করেন। তিনি যে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন, তাতে কিছু ছিল যুক্তি, বেশির ভাগই ছিল আবেগ এবং কিছু ছিল ক্ষোভ।” রবীন্দ্রনাথের সাথে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ সখ্যতা ছিল। শিলাইদহ যাওয়ার আগে তাঁর সাথে এবং রাজনীতিবিদ সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর সাথে কবির একাধিকবার বৈঠক হয়েছিল বরে তথ্য রয়েছে। এতে অনেকেই মনে করে থাকেন যে, রীবন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁদের দলভূক্ত ছিলেন। কিন্তু এসব বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ তাঁদের সাথে সহমত পোষণ করেছিলেন কী-না সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রমাণ নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন এর কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। তিনি পূর্ববাংলার এ প্রাণের দাবির প্রতি সহমত পোষণ করেছিলেন কি-না, এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

উপরের আলোচনায় দেখা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ও সংস্কৃতিজীবীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারি সিদ্ধান্তের চরম বিরোধিতা করেন। তথ্যসূত্র থেকে জানা যায় যে, বাবু গিরিশ চন্দ্র ব্যানার্জী, ড. স্যার রাসবিহারী ঘোষ এবং স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখের নেতৃত্বে হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে ১৮ বার স্মারকলিপি পেশ করেছিলেন। তাদের এ বিরোধিতার পেছনে আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত ছিল সন্দেহ নেই, তবে তদাপেক্ষা বেশি ছিল সাম্প্রদায়িক চেতনা বুদ্ধি। মুসলিম সংখ্যাগুরু পূর্ববঙ্গে উচ্চশিক্ষার বিকাশ তাঁদের কাছে কাম্য ছিল না। এমনকি পূর্ববঙ্গের মানুষকেতো তাঁরা সভ্য বলেই মনে করতেন না। সেকালে কলকাতার অনেক বুদ্ধিজীবী মনে করতেন, পূর্ববঙ্গের মানুষের আবার কালচার কি? তাদের কালচার হলো “এগ্রিকালচার”। আর এ অসভ্য, অশিষ্ট মানুষের আবার উচ্চশিক্ষার কি দরকার! তাছাড়া ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা আগে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। এটি ছিল মূলত একটিAffiliating University। বাংলা ও ব্রহ্মদেশের সকল কলেজ এর অধিভুক্ত ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্রাজ্য সংকুচি হয়ে পড়বে, তাদের আয় ও গুরুত্ব হ্রাস পাবে এমন আশঙ্কাও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মহল ও সেখানকার বুদ্ধিজীবীদের মনে ছিল। তাই তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতায় নেমেছিলেন।

[চলবে]

পড়ুন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মকথা (দ্বিতীয় পর্ব)

লেখক: অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: s_rahman_khan@yahoo.com