টাকা নেই, ১ জুন থেকে বন্ধ হতে পারে ঢাবির করোনা পরীক্ষা!

সম্প্রতি করোনা পরীক্ষার ল্যাব উদ্বোধন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান  © ফাইল ফটো

করোনা পরীক্ষার ল্যাব চালু রাখতে হিমশিম খাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে অবহিত করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক সংকট, ল্যাব স্পেশালিস্টের অভাবসহ চার কারণে বেশি দিন চালু রাখা সম্ভব হবে না।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পেয়ে গত ৫ মে করোনার নমুনা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ল্যাবটি চালু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাবির উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র (কারস) ভবনে এই ল্যাব স্থাপন করা হয়। শুরু থেকে করোনা পরীক্ষার কিট, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দিয়ে আসছে। তবে এর বাইরেও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক যে খরচ, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেই ব্যয় করা হচ্ছে। তবে এই ব্যয় আর বহন করতে পারবে না তারা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি এবং ল্যাব পরিচালনা করার খরচ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় করোনাভাইরাস রেসপন্স টেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. শরীফ আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, ল্যাব পরিচালনা করতে প্রতিমাসে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার আর্থিক খরচ হচ্ছে, যা বহন করা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে কঠিন এবং বাড়তি চাপ।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি শিক্ষা এবং গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান। এটা কোন মেডিকেল নয়, স্বাস্থ্যসেবামূলক কোন প্রতিষ্ঠান নয়। তার চেয়ে বড় কথা হলো আমাদের ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ল্যাবে যারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং চলমান শিক্ষার্থী। তারা কাজটি সম্পূর্ণ ভলেন্টিয়ারি করে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে অথবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোন প্রণোদনা না দেওয়া হয়; তাহলে একসময় কাজে অনীহা চলে আসাটা স্বাভাবিক। করোনা টেস্টিং ল্যাব পরিচালনায় কিছু আর্থিক খরচ আছে, যা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেয় না। এ কারণে আর্থিক চাপ পুরোপুরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর এসে পড়ে। আমরা আপদকালীন সময়ে এই সেবা চালু করেছি।

ড. শরীফ আখতারুজ্জামান আরও জানান, যারা কাজ করছে তাদের অন্তত ১৫ দিন পরপর বিশ্রাম প্রয়োজন তারা সেই সময়টুকু পাচ্ছে না। যারা ল্যাব পরিচালনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়ে স্বেচ্ছা শ্রম দিচ্ছেন, তাদের আইসোলেশনে থাকতে হচ্ছে। তাদেরকে নির্দিষ্ট কোন পিপিই পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষে থেকে দেওয়া হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের প্রণোদনার আওতায় আনা উচিত ছিল।

তিনি আরও বলেন, আমরা চারটি কারণে আমাদের এই করোনা পরীক্ষার ল্যাব অনির্দিষ্টকালের জন্য চালিয়ে নিতে পারবো না।  প্রথমত, যারা আমাদের এই করোনা পরীক্ষার ল্যাবে কাজ করে তারা কোন স্পেশালিষ্ট না। তারা হলো তৃতীয় কিংবা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। তাদের কোন মেডিকেল ব্যাকগ্রাউন্ড নাই। যার কারণে তারাও কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন।

দ্বিতীয়ত, আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোন ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা পাইনি। আর বিশ্ববিদ্যালয় তো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এটা কোন মেডিকেল নয়। যার কারণে আলাদা কোন বাজেট নাই। প্রতিমাসে ১৫-২০ লক্ষ টাকা খরচ হয়। তাই এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ভর্তুকি দিয়ে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত, স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যারা কাজ করছে তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে, গবেষণা করে। হয়ত অল্প কয়েকদিন পরে সীমিত পরিসরে অফিস-আদালত খোলা হচ্ছে। তারা তাদের স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানে চলে যাবেন। যারা কাজ করছে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কোন ধরণের আর্থিক সহায়তা, লজিস্টিক সাপোর্ট তারা পাচ্ছে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোন ধরণের প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়নি। এমনকি স্বাস্থ্য প্যাকেজের অধীনেও রাখা হয়নি।

চতুর্থত, লজিস্টিক সাপোর্ট, বিভিন্ন অনুষদ এবং ডিপার্টমেন্টের ইকুয়েপমেন্ট, যন্ত্রপাতি নিয়ে উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে এটি স্থাপন করা হয়। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের যন্ত্রপাতিগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব নয়। কারণ, তাদের গবেষণার বিষয় রয়েছে। তাদের ডিপার্টমেন্টের অভ্যন্তরীণ বিষয় রয়েছে। সার্বিকভাবে বলতে গেলে আমাদের সীমাবদ্ধতা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোন সাপোর্ট না থাকায় আমাদের পক্ষে অনির্দিষ্টকালের জন্য করোনা পরীক্ষা করার ল্যাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে আমি মনে করি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন সায়েন্সেসের পরিচালক অধ্যাপক ড. এম এ মালেক জানান, আমাদের টেকনিক্যাল কমিটি কয়েকদিন পরপর কাজের একটি রিভিউ দেয়। কতটুকু কাজ হয়েছে, কাজ কতটুকু হবে, সীমাবদ্ধতাসহ নানান বিষয়ে আলোচনা করার পর সবশেষে গত রিভিউ বৈঠকে টেকনিক্যাল কমিটি জানিয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে যদি সহযোগিতা করা না হয় তাহলে আমাদের পক্ষে আগামী ৩১ মে এর পর কাজ করা সম্ভব নয়। যা সক্ষমতা আছে তা দিয়ে হয়তো ৩১ মে পর্যন্ত ল্যাব চালাতে পারব।

তিনি আরও বলেন, আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বরাবর চিঠি দিয়েছি। এবং চিঠিতে জানানো হয়েছে যে, ৩১ তারিখ পর্যন্ত আমরা চালাব। আমাদের বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি এতদিন সহায়তা করেছে বলে চালানো গেছে। এরপর হয়তো আর সম্ভব হবে না। যদি সরকার সহায়তা করে তাহলে চালানো সম্ভব হবে, অন্যথায় চালানো সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি ল্যাব চালানো কেন সম্ভব নয় তার চারটি কারণ আমরা চিঠিতে উল্লেখ করেছি।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, আমরা টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করেছি। আমাদের ল্যাবের কাজ চালানোর জন্য এলামনাই এসোসিয়েশন, শুভাকাঙ্ক্ষী, বিভিন্ন অনুষদ, ডিপার্টমেন্ট আমাদের সহযোগিতা করেছে। সেই অনুপাতে আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা অতিসত্বর এ ব্যাপারে টেকনিক্যাল কমিটির সাথে আলোচনায় বসবো তখন আমরা এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে পারবো।


মন্তব্য

এ বিভাগের আরো সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ