নিহত–নিপীড়িতদের মুখচ্ছবি দেয়ালে দেয়ালে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতে নির্যাতিত এহসান রফিক।  © টিডিসি ফটো

বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে আঁকা প্রতিবাদী চিত্রে ফুটে উঠেছে নির্যাতনে নিহত ও গুরুতর আহত শিক্ষার্থীদের মুখ। আবু বকর, এহসান রফিক, হাফিজুর মোল্লা ও আবরার ফাহাদের মুখ বলে দিচ্ছে ছাত্ররাজনীতির নামে চলা নির্যাতন-নিপীড়নের নৃশংস সব ঘটনা। এর মধ্যে শুধু প্রাণে বেঁচে আছেন এহসান। তবে নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে আঁকা এসব দেয়ালচিত্র ‘গ্রাফিতি’ নামে পরিচিত। সাধারণত কোনো রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার শিল্পিত মাধ্যম হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর ব্যবহার দেখা যায়।

বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার হত্যার পর প্রতিবাদের অংশ হিসেবে দুটি গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের দেয়ালে। এর একটিতে দেখা যায় সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলে নির্যাতনের শিকার এহসান রফিকের রক্তাক্ত ও বিধ্বস্ত চেহারা। সহপাঠীর কাছ থেকে ক্যালকুলেটর ধার নেওয়া নিয়ে গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মারধরের শিকার হন তিনি। দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীকে হলের একটি কক্ষে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। এতে তাঁর বাঁ চোখের কর্নিয়া গুরুতর জখম হয়, কপাল ও নাক ফেটে যায়। পরে নিরপত্তাহীনতার কারণে দেশ ছাড়েন। বর্তমানে মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন তিনি।

কলাভবনের দেয়ালের যে পাশে এহসানের গ্রাফিতি আঁকা, তার পাশের চিত্রটি আবু বকরের। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে স্যার এ এফ রহমান হলে সিট দখল নিয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুরুতর আহত হওয়ার এক দিন পর তিনি মারা যান। দিনমজুর বাবার ছেলে আবু বকর তৃতীয় সেমিস্টার পর্যন্ত সিজিপিএ-৪-এর মধ্যে ৩.৭৫ পেয়েছিলেন। চতুর্থ সেমিস্টারের ফল বের হওয়ার আগে তিনি খুন হন। ওই বিভাগে তাঁর আগে এমন ভালো ফল কেউ করেননি। মা রাবেয়া খাতুন তিন বছর মাথায় তেল না দিয়ে সেই টাকা ছেলের পড়ার খরচ চালানোর জন্য সঞ্চয় করেছিলেন।

এহসান ও আবু বকরকে নিয়ে ওই দুটি গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মঞ্চ ‘বৈধ সিট আমার অধিকার’-এর উদ্যোগে। মঞ্চের অন্যতম সংগঠক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী আরমানুল হক অভিযোগ করেন, গত বুধবার দুপুরে গ্রাফিতি দুটি আঁকার পর কলা অনুষদের ডিন আবু মো. দেলোয়ার হোসেন তাঁকেসহ আঁকিয়ে মুমিন মুক্তারকে ডেকে পাঠান। দেয়ালচিত্র আঁকার জন্য তাঁদের পুলিশে দেওয়ার হুমকি দেন, গ্রাফিতি মুছে ফেলতে বলেন। পাশাপাশি বাবার নাম-ঠিকানা, ফোন নম্বর নিয়ে তাঁরা আর এ ধরনের গ্রাফিতি আঁকবেন না মর্মে স্বীকারোক্তি নেন।

অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করে ডিন আবু মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি তাঁদের ডেকেছি এটা সত্য। তাঁরা দেয়ালে কী এঁকেছে, তা এখনো আমি দেখিনি। তাঁদের বুঝিয়ে বলেছি, কলাভবনের দেয়াল নতুন করে রং করা হয়েছে। আর এখানে আঁকাআঁকি করা আগে থেকেই নিষেধ।’

একই মঞ্চের উদ্যোগে সম্প্রতি উপাচার্যের বাসভবনসহ ডাকসু ভবনের দক্ষিণ পাশের দেয়াল, ক্যাফেটেরিয়ার দেয়াল ও প্রবেশমুখে আঁকা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী হাফিজুর মোল্লার গ্রাফিতি। সাড়ে তিন বছর আগে মার্কেটিং বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হাফিজুরের করুণ মৃত্যু দেখেছিল বাংলাদেশ।

অটোরিকশাচালকের ছেলে হাফিজুরের বাসা ভাড়া করে থাকার সামর্থ্য ছিল না। তাই ছাত্রলীগের ‘বড় ভাইদের’ মাধ্যমে উঠেছিলেন এসএম হলের বারান্দায়। গভীর রাতেও তাঁকে যেতে হতো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে। ২০১৬ সালে জানুয়ারি মাসে এক শীতের রাতে তাঁকে সারা রাত হলের বাইরে খোলা জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। পরে নিউমোনিয়া ও টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। গ্রাফিতিতে হাফিজুরকে হাজির করা হয় গেস্টরুম অত্যাচারের প্রতীক হিসেবে।

কলাভবন ও ডাকসু ভবনের দেয়ালসহ বুয়েটের প্রধান প্রবেশপথ ও হলগুলোর দেয়াল ভরে উঠেছে আবরার হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে আঁকা গ্রাফিতিতে। এই গ্রাফিতিগুলো আঁকা হয়েছে স্টেনসিল (লেখা বা আঁকার জন্য ছিদ্রময় পাত) ব্যবহার করে। যার প্রতিটির পাশে লেখা ‘জাস্টিস ফর আবরার’।

বছরখানেক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ও রোকেয়া হলের দেয়ালে আঁকা দুটি গ্রাফিতি ব্যক্তিপরিসর ছাড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ছড়িয়েছিল। এর একটি মূর্ত করে তুলেছিল সিংহাসন ফুটো করে বেরিয়ে আসা একটি পেনসিলের চোখা প্রান্ত। পাশে লেখা ছিল, ‘উফ!’ আরেকটি চিত্র বাংলাদেশের মানচিত্রের ওপর রাখা ছিল রিমান্ড কক্ষের বাতি। পাশে মোটা হরফে লেখা ছিল, ‘বাংলাদেশ রিমান্ডে’।

কাছাকাছি সময়ে ওই দেয়াল দুটিতেই আঁকা হয়েছিল ‘সহমত ভাই’ ও ‘হেলমেট ভাই’ নামের দুটি আলাদা গ্রাফিতি। দর্শনার্থীরা ‘সহমত ভাই’কে সংযুক্ত করেছিলেন সমাজে বিদ্যমান তোষামোদির চর্চার সঙ্গে। আর ‘হেলমেট ভাই’ সম্পর্কে তাঁদের মূল্যায়ন ছিল, এরা তোষামোদির চর্চাকারীদের পক্ষে কাজ করা পীড়নকারীদের দল।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ