ঝুলে যাচ্ছে সাত কলেজ ইস্যু!

ঝুলে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত কলেজ সংকট ইস্যু। সূত্র বলছে, প্যানেল নির্বাচনের এক মাস পরও বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ হয়নি। কবে হবে, তা নিয়েও প্রকৃত তথ্য কারো জানা নেই। আবার ইস্যুটি সমাধানে ছাত্রলীগ নেতারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আগস্ট (প্রথম সপ্তাহ) পর্যন্ত সময় নিলেও তারও কোনো ফলোআপ নেই। অন্যদিকে বেঁধে দেয়া সময়ও পার করতে চলেছে সুপারিশ কমিটি। সবমিলিয়ে অধিভুক্ত এসব কলেজের সমস্যা সমধানে ঢাবি প্রশাসনের মধ্যে এ ধরণের গা ছাড়া ভাব দেখা যাচ্ছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশ কমিটির আহ্বায়ক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ  দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, আগামী ৩ তারিখ একটি বৈঠক আছে, সেখানে কিছু বিষয়ে আলোচনা হবে।

সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা বলছেন, ঢাবি প্রশাসন এখন নতুন উপাচার্যের নিয়োগ নিয়ে ব্যস্ত। সাত কলেজ সমস্যা সমধানে তাদের মন নেই। তাছাড়া নতুন উপাচার্য (যদি আখতারুজ্জামানের বাইরে কেউ আসেন) আসলে ইস্যুটি তিনি কীভাবে দেখবেন, সেটাও ভাবার বিষয়। তাদের ভাষ্য, সাত কলেজ সমস্যার যৌক্তিক সমাধানের কোনো অগ্রগতি নেই। অধিভুক্তি বাতিল কিংবা বহাল প্রশ্নটা পরে, আগে তো ছাত্রদের জীবন। কলেজগুলোয় দিনের পর সমস্যা  চলছে, ঢাবি প্রশাসনকে সেই সমধান আগে দিতে হবে।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এটা তাড়াহুড়ার কোনো বিষয় নয়। রিপোর্ট জমা দেয়ার সময় ৩০দিন বাড়ানো হয়েছে। এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আমরা ছাত্রনেতা, বিভাগের চেয়ারম্যান, কলেজগুলোর প্রিন্সিপাল অর্থাৎ সব স্টেইকহোল্ডারদের সাথে আলোচনা, মতামত ও পরামর্শ নিয়েই রিপোর্ট তৈরি করব। তাই রিপোর্ট তৈরি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

আর উপাচার্য অধ্যাপক মো.আখতারুজ্জামান বলেন, অধিভুক্তি বাতিল হবে কি হবে না সেটা নির্ভর করছে সুপারিশ কমিটির রিপোর্টের উপর। কমিটির রিপোর্ট এখনো আমাদের হাতে আসেনি। রিপোর্ট আসলে বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকার বসে সিদ্ধান্ত নেবে।

এদিকে অধিভুক্ত বাতিল চাওয়া ঢাবি শিক্ষার্থীরা বলছেন, ইস্যুটি নিয়ে প্রশাসন ‘গাফিলতি’ করছে। সাত কলেজ অধিভুক্তি বাতিল আন্দোলনের একজন মুখপাত্র শাকিল মিয়া বলেন, প্রশাসন প্রথমে ১০ কার্যদিবস সময় নেয়ার পর আরো ৩০ কার্যদিবস সময় বৃদ্ধি করে। আমরা এ সময়ক্ষেপণকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গাফিলতি হিসেবে মনে করছি। এ বিষয়ে প্রশাসনের কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ আমরা দেখছি না বরং তারা কাজে ধীরগতি দেখাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দাবি আদায় না হলে পুনরায় আন্দোলনে নামবো। অধিভুক্তি বাতিলের মাধ্যমেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে। অন্য কোনোভাবে নয়।

আসিফ মাহমুদ নামে ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, গত জুলাই মাসের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি কমিটি গঠন করে ‘সাত কলেজ’ সমস্যার সমাধানের জন্য। আমরা সেই কমিটির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। আমাদের পক্ষ থেকে ডাকসুর সঙ্গে সাক্ষাতে বলা হয়েছিল ‘অধিভুক্তি বাতিলই একমাত্র সমাধান’। অধিভুক্তি বাতিল ভিন্ন অন্য কোন সিদ্ধান্ত সাধারণ শিক্ষার্থীরা মেনে নেবে না। এখন প্রশাসন যদি অধিভুক্তি বাতিল না করে কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে কালক্ষেপন করে তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা আবার আন্দোলনে নামবে এবং অধিভুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত না হওয়া অবধি আন্দোলন চালিয়ে যাবে।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) শিক্ষার্থীদের সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের পক্ষে কাজ করবে বলে ঘোষণা দিলেও সে কথা রাখেনি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাকসুর ভিপি ও ১১সদস্যের কমিটির সদস্য নুরুল হক নুর দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কমিটির কাজের ব্যাপারে আমাদের মন্তব্য করতে নিষেধ করা হয়েছে। যেহেতু আমাদের এখনো পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, সেহেতু এখন পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, আমি একাধিকবার বলেছি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সকল যৌক্তিক দাবীর প্রতি আমার শতভাগ সমর্থন আছে। সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের আন্দোলনে ডাকসুর সমর্থন ছিল এবং আমরাও কিন্তু তাদের দাবীর বাইরে না।

অন্যদিকে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা বলেছেন, অধিভুক্ত ইস্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটির সিদ্ধান্ত সাত কলেজবিরোধী হয়, তবে তা কোনভাবেই মানা হবে না। আন্দোলনের সমন্বয়ক এ কে এম আবু বকর দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, প্রশাসনের ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি। আশা করছি, আমাদের দাবি আদায় হবে। তার ভাষ্য, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে আমাদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে বলে জানিয়েছে সুপারিশ কমিটি। সেখানেই দাবি তুলে ধরব এবং তা বাস্তবায়িত হবে।

এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, অধিভুক্তি যদি বাতিল করতেই হয়, তবে আমাদের দুই বছরের যে সেশন জটিলতা হয়েছে অর্থ্যাৎ আমাদের শিক্ষা জীবনের পিছিয়ে যাওয়া বছরগুলো ফিরিয়ে দিতে হবে। তিনি বলেন, আমরা যে সাধারণ শিক্ষার্থী সবাই তা ভুলে গিয়ে একবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, আরেকবার ঢাবিতে নিচ্ছে। ভবিষ্যতে সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের জীবন বিপন্ন করার সুযোগ দেওয়া হবে না।

তথ্যমতে, ২০১৯-২০২০ সেশন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত রাজধানীর সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলসহ চার দফা দাবিতে গত ১৯ জুলাই শাহাবাগ অবরোধ করে আন্দোলন শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সাত সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত করা হয়। এগুলো হচ্ছে- ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ। অধিভুক্ত হওয়ার পর থেকেই নানা সংকট লেগেই আছে এসব কলেজের। ফলে লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।

এ কারণে তারা কখনও পরীক্ষার রুটিন, কখনও ফলের দাবিতে রাজধানীর নীলক্ষেত ও শাহবাগের মোড় অবরোধ করছে শিক্ষার্থীরা। এ আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে তিতুমীর কলেজের আবু বকর সিদ্দিক নামে এক শিক্ষার্থী চোখও হারিয়েছে। তবুও সুফল পায়নি সাত কলেজের লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর। তাই বারবার রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে তারা।


মন্তব্য