ডিবি কার্যালয় থেকে শামসুন নাহার হলের ভিপি (দ্বিতীয় পর্ব)

  © টিডিসি ফটো

ডিবির সবাই চলে গেল। ওসি আমাদেরকে কফি দিতে বললেন। আমি মানা করে দিলাম। কফি গেলার মতন মানসিক অবস্থা তো ছিলই না, আগের রাতে না ঘুমানোর কারণে টানা চল্লিশ ঘন্টার উপরে জেগে থেকে শরীরও চলছিল না। তার উপর আবার দুপুর থেকে না খাওয়া, খালিপেটে কফি খেতামই বা কিভাবে? ম্যামকে ঘটনা খুলে বললাম। কিন্ত ওসি মহাশয়ের দরদ বেয়ে বেয়ে পড়ছিল। তিনি বললেন, কফি না নিলে ধরে নেব আপনি এখনো রাগ করে আছেন।

আমি নিজের ধৈর্য দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। যে মেয়ে সামান্য কথাতেই রেগেমেগে একাকার হয়ে যায়, সেই মেয়েটা এরকম বীভৎস একটা উপহাসে জাস্ট নির্বিকার রয়ে গেলো। আসলে আমার স্নায়ুগুলো আর পেরে উঠছিল না। এর আগে এত বেশি চাপ ওদের ওপর দিয়ে যায়নি তো কখনো, তাই আরকি। শান্তভাবে জাস্ট উত্তর দিলাম, খুশি হওয়ার মতন কিছু তো ঘটেনাই৷ উত্তর শুনে ওসির মুখ কালো হয়ে গেল।

আমি হলে যাবার জন্য অস্থির হয়ে গেলাম। গায়ের জামাটা ছেঁড়া, ট্রাউজারটাও পুরোনো। পায়ে স্পঞ্জের জুতো। ওই অবস্থায় আমাকে নির্যাতিত কোনো কাজের মেয়ে ভেবে যে কেউই কনফিউজড হয়ে যেত আমি নিশ্চিত। ম্যাম বললো হলে যাওয়া যাবে না। আমি আর নিতে পারতেসিলাম না। শান্তভাবেই জিজ্ঞেস করলাম কেন যাবনা? মামলা তো দেয়নি, ছেড়েও দিয়েছে। তাহলে হলে যেতে অসুবিধা কোথায়। কাঁদার মতন শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই আমার মাঝে। তবুও চোখ দিয়ে অনর্গল পানি পড়তে লাগলো। আমার ছেঁড়া জামা, জুতার কথা বললাম এতগুলো লোকের সামনে। এই অবস্থায় এতরাতে আমি কোথায় যাব। আর তাছাড়া আমাকে রেখে গিয়েছে হল প্রশাসনের জিম্মায়, আমাকে বলেছেও যে হলেই যাব আমি, কিন্ত না। মামাকে ফোন দেয়া হয়েছে। রাত সোয়া দুইটা তখন। আমি প্রচন্ড অবাক হলাম। বললাম মামার বাসায় যাব না, হলে যাব। আমার কথা কোনোভাবেই মানলেন না ম্যাম। কম করে হলেও দশবার রিকোয়েস্ট করেছিলাম। শেষমেশ না পেরে বললাম, আমি এককাপড়ে কই যাব এখন? অন্তত দশটা মিনিটের জন্য যাইতে দেন। আমার জামাটা ছেঁড়া, ঈদের আগে তো আর আসা হবেনা। আমি কয়টা জামাকাপড় নিয়ে আসি। ম্যাম তাতেও রাজি হলেন না। কোনোভাবেই আমি এখন হলে যেতে পারব না। সকালে আমার আব্বু হলে এসে ব্যাগ নিয়ে যাবে। আর আমার রুমমেটরা জামাকাপড় দিয়ে দেবে।

প্রথম পর্ব দেখুন: শামসুন নাহার হল থেকে ডিবি কার্যালয়ে যাওয়ার রোমহর্ষক বর্ণনা

আমার মাথায় এবার রক্ত উঠে গেল। আমি বলতে শুরু করলাম, আমাকে ছেড়ে দেবার পরেও এই নাটক কেন করতেসে। আর ডিবি তো আপনার কাছেই দিয়েছে, আমার মামার কাছে তো দেয়নি। তাহলে আমি আমার মামার সাথে কেন যাব? আমি হলে যেতে চাইলাম তাও দিলেন না, এখন মাত্র দশটা মিনিট সময় চাচ্ছি, তাও কেন দিবেন না? রড, রামদা, হকিস্টিক আলাদের তো দুধেভাতে পালতেসেন, বিভিন্ন চ্যানেলে তাদের কৃতকর্মের ফুটেজ থাকার পরেও তাদের আদর করে হলে রেখে তোষণ করে পালতেসেন, আমি ছাড়া পাবার পরেও কেন হলে যেতে পারব না? সবার মাথা নিচু। কোনো উত্তর নেই। ওসিও বিব্রত। আমি ওসিকে বললাম, আপনি তো শাহবাগ থানার ওসি। আপনি ব্যবস্থা নেন না কেন এদের বিরুদ্ধে। এরা যে হলে অস্ত্র নিয়ে থাকে তা তো ওপেন সিক্রেট। অনেক, অনেক প্রমাণ আছে এদের অপকর্মের। তামশা দেখেন কেন? সে সাফ জানিয়ে দিল এটা নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমাকে হলে থাকতে দেবে কি দেবেনা, সেটাও। এটা নিয়ে সে কোনো মন্তব্য করবে না।

আমি এবার বললাম, তার চাইতে হাতে ইয়াবা ধরায়ে ক্রসফায়ারে দিয়ে দেন আমাকে। আপনারা তো করেন এইগুলা। আমাকে মুক্তি দিয়ে দেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কারণে আমার বিশ্ববিদ্যালয়, আমার রাষ্ট্র আমাকে যে প্রতিদান দিয়েছে, আমি আর নিতে পারতেসি না। আমাকে মুক্তি দিয়ে দেন। সে বললো, প্রমাণ ছাড়া নাকি কখনো ক্রসফায়ার দেয়া হয়না। আমি কক্সবাজারের একরামের কথা জিজ্ঞেস করলাম। বেচারার মুখ আবার কালো হয়ে গেল। কারোর মুখে কোনো কথা নেই। সবাই নিশ্চুপ বসে আছে মাথা নিচু করে। আমি কাঁদছি।

এরমধ্যে মামা চলে আসলো। সাথে সুমন ভাইয়া। এবার আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের বুলি ফুটলো। তারা খুব মহৎ কাজ করেছেন, এত রাতে আমার জন্য থানায় এসে কতবড় দয়া আমাদের উপর করেছেন, মামাকে বলতে লাগলেন। মামাও আক্ষেপ করে বললেন, আমি মেয়ে না হলে এতরাতে নাকি তিনিও আসতেন না। আমার লোকাল গার্জিয়ান হবার মাশুল সারাটা জীবন দিয়ে গেল মানুষটা। আমার কারণে রাত নেই, দিন নেই, সময় নেই, অসময় নেই, বিভিন্ন সময়ে তলব করা হয়েছে তাকে। আমি অপরাধবোধে কুঁকড়ে গেলাম। মামাকে বললাম এত রাতে কেন মামা আসছে, আমাকে হলের জিম্মায় দিয়ে গেছে, আমি হলে যাব। মামা ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলেন আমাকে। আমি মামাকে বললাম জামাকাপড় আনতেও যেতে দিচ্ছেনা আমাকে। মামাও রিকোয়েস্ট করলেন। তখন মামাকে বলা হলো এত রাতে নাকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এসব "ঝুট ঝামেলা" চায় না! তারা বড়জোর বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িতে করে মামার বাসায় পৌঁছে দিতে পারে আমাকে, রাত বেশি হয়ে গেছে সেজন্য।

ঘেন্নায় বমি পেল আমার। মামাকে বললাম উবার কল করতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িতে আমি যাবনা। এই বলে উঠে গায়ের সমস্ত শক্তি রুমের দরজার উপর প্রয়োগ করে বাইরে বেরিয়ে এলাম। তখন আপাতত আর বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছা আমার মধ্যে ছিলনা। ইচ্ছে ছিল থানার সামনে চলন্ত গাড়ির নিচে ঝাপ দেব। আমাকে এভাবে বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখে থানার বাকিরা দৌড়ে গিয়ে আমার পথ আটকালো। আমাকে বাইরে যেতে দেবে না। আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, বাইরে যাবার স্বাধীনতাটুকুও নেই আমার? ওরা চুপ করে মাথানিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো, কোনো উত্তর দিল না। আমি দুইহাত জোড় করে বললাম তাহলে আমার ব্যাগে ইয়াবা ঢুকায়ে দিয়ে আমাকে মেরে ফেলেন। আমি বের হবার সময় থানার দরজায় লাথি মেরে বেরিয়েছি, এরজন্যও তো আমাকে মেরে ফেলতে পারেন। এতোটুকু সাহায্য করেন আমাকে। দোহায় আপনাদের। আমি আর সহ্য করতে পারতেছি না। সুমন ভাইয়া আমার পেছন পেছন দৌড়ে এসেছিল। আমাকে শান্ত করতে ধমক দিল। আমি আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলাম। ওসির রুমের বাইরে মামার সাথে ওসি আর স্যার ম্যাম কি যেন কথা বলছিল, আমি গেট থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম না কিছু। দেরি হচ্ছিল আসতে। পরে জানতে পেরেছিলাম, আমাকে সেই রাতে থানায় কাস্টাডিতে রেখে দিতে চেয়েছিল। ওসি খুব ক্ষেপেছিল আমার ওপর। মামা কোনোরকমে হাতেপায়ে ধরে নিয়ে এসেছিল। আমার জন্য মানুষটাকে আর কোনোদিন অপদস্ত না হওয়া লাগুক। দেশের জন্য যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা মানুষটাকে আর কখনো কারও কাছে ছোট না হওয়া লাগুক।

গাড়ি আসলো। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল। মামা আমাদের নিয়ে গাড়িতে বসলো। একেবারে ফাঁকা রাস্তা, একফোঁটা জ্যাম নেই। গাড়ির জানালায় পানির বিন্দু। আমি অসহায়ের মতন বাইরে তাকিয়ে আছি। নিজেকে মুক্তির জন্য তড়পাতে থাকা বন্দি চড়ুইটার মতন মনে হচ্ছিল। মামার বাসায় আসলাম। মামী, নিশিপু কারোর মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছেনা। আমাকে দেখে মনেহয় একটু স্বস্তি পেল ওরা। আমি হাউমাউ করে কেঁদে দিয়ে মামাকে জিজ্ঞেস করলাম আমাকে কেন এখানে নিয়ে আসলেন? হলে কেন যেতে দিলেন না? এতবড় অন্যায় কেন হতে দিলেন। তারপর মামা ঘটনা বললো, কিভাবে হাতেপায়ে ধরে আমাকে ছাড়ায়ে নিয়ে আসছে। আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম একেবারে। আর বলার কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। ফ্রেশ হতে বাথরুমে চলে গেলাম। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে কিছুক্ষণ কাঁদলাম। তারপর গায়ে পানি ঢালতে লাগলাম। আমার ইচ্ছে করছিল সব পাপ ধুয়ে পানির সাথে বের করে দিতে, কিন্ত ও বেচারাও সে রাতে আমার সাথে নেই বুঝতে পেরেছিলাম। শরীরে আর একদম বল নেই। গোসল করে বেরিয়ে আসার পর মামী ভাত দিলো। আমার খাওয়ার মতন শক্তি নেই। তারপর শরবত দিয়ে বললো অন্তত শরবতটা যেন খাই, নাহলে আমি বাঁঁচব না। দুইগ্লাস শরবত খেলাম। তারপর ফ্লোরেই শুয়ে পড়লাম। আর নড়ার শক্তি নেই। বাসা থেকে আব্বু ফোন দিল। মামা ধরায়ে দিল। আমি লজ্জায় কথা বলতে পারলাম না। আব্বু বললো, তুই ঠিক আছিস? মানসিকভাবে স্ট্রং থাক। আমরা সবাই তোর পাশে আছি। নিজের মেয়েকে এমন ভালোভাবে খুব কম বাবাই পড়তে পারে। আমার মধ্যে যে ঝড় যাচ্ছিল, আমার আব্বুটা তা ফিল করতে পারছিল। বুঝতে পারছিলাম আমি। আমি শুধু বললাম, আব্বু, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। আব্বু রেস্ট করতে বলে ফোন রেখে দিল। তারপর কি হয়েছে আমি আরকিছু জানিনা।

ঘুম ভাঙলো পরেরদিন দুপুর একটায়। আব্বু চলে এসেছে। আমার সাথে দেখা করে তারপর হলে যাবে। উঠে ফ্রেশ হয়ে দুইজন একসাথে খেলাম। আব্বু কিছুক্ষণ রেস্ট করে সাড়ে তিনটার দিকে বেরিয়ে গেল হলের উদ্দেশ্যে। হলে কথা বলে আব্বু চলে আসলো। আমার রুমমেটদের তখন খুব প্যারা নিতে হয়েছিল আমার জন্য। আব্বু আসলো ব্যাগ নিয়ে। সন্ধ্যা থেকে প্রায় রাত দশটা আমাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলো। আমরা ঘুমোলাম রাত ১২টার দিকে। সকালে আবার তাড়াতাড়ি না উঠতে পারলে বাসায় ফিরতে দেরি হবে। ১৬তারিখ সকালে আমরা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম...

বাসায় এসে সবার মুখ দেখে বুঝতে পারলাম কি পরিমাণ ক্ষত হয়ে গেছে আমার কারণে তাদের মধ্যে। ফ্রেশ হয়ে আসার পর আম্মু ভাত দিল। খেতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম, আমার গলা দিয়ে ভাত ঠিক নামছে না। অবাক হলাম না, '১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একবার হয়েছিল মাসখানেকের জন্য এরকম। ডিপ্রেশনের কোন একটা স্টেজে যেন হয় এরকম। ইটিং ডিসঅর্ডার না কি যেন বলে এটাকে। এবার সপ্তাহখানেক ছিল। বাসাটা একেবারে খাঁচা মনে হতে লাগলো আমার। দম বন্ধ হয়ে আসে, বাইরে যেতেও ইচ্ছে করেনা। কিছুটা বলার জন্য ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে থাকি, আবার কারোর সাথে কথা বলতেও ইচ্ছা করেনা। আমার ফোন ফেরত দেয়নি ডিবি থেকে। বাসায় বইখাতা কিছুও নিয়ে আসা হয়না৷ টিভি দেখতেও অসহ্য লাগতো। বেডরুমের বালিশে মাথা ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে আমার দিন কাটতে লাগলো। আমার আব্বুটা যত বড় অন্যায়ই করি না কেন, আমার চোখে পানি দেখলে আমাকে বেশি কিছু বলতে পারতনা আমি বাইরে আসার পর থেকে। সে এসে দেখত আমি শুয়ে শুয়ে কাঁদতেসি। আমি এক কোণে গুটিসুটি মেরে কাঁদতাম, আমার আম্মুটা আরেক পাশে অসহায়ের মতন বসে থাকতো। নিজেকে সন্তান হিসেবে দুনিয়ার সবচাইতে অযোগ্য, নিকৃষ্ট মনে হত আমার। নিজের সাথে সাথে পুরো পরিবারটাকে ডুবিয়েছিলাম আমি। এর মাঝে কোরবানির ঈদ আসলো। আমি তো নিজেকে ১৫ আগস্ট রাতেই কুরবানি দিয়ে এসেছিলাম শাহবাগ থানায়, আমার আবার কিসের ঈদ! গতবছরের কুরবানি ঈদের কোনোকিছুই মনে নেই আমার...

লেখক: ভিপি, শামসুন নাহার হল সংসদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


সর্বশেষ সংবাদ