মিষ্টি খাওয়া নয়, জাবি ছাত্রলীগের দ্বন্দ্বের মূলে ৪৫০ কোটি টাকা

গত ৩ জুলাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাওলানা ভাসানী হল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে রামদা, লোহার লট, স্টাম্পসহ দেশি অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষ হয়। এর একপর্যায়ে প্রায় ২০ রাউন্ড গোলাগুলিও করা হয়। এতে শিক্ষক-সাংবাদিকসহ অন্তত ৬০ থেকে ৭০ জন আহত হয়েছে।

ক্যাম্পাসে এরেক পর পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, গোলাগুলি ও অস্ত্রের ঝনঝনাটিতে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। হুমকির মুখে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ। আবাসিক হলগুলোতে দেশি অস্ত্রের মজুদ ও আগ্নেয়াস্ত্র থাকার অভিযোগের পরও প্রশাসন কেনো তা উদ্ধারে তৎপর হচ্ছে না তা রহস্যজনক, মন্তব্য করছেন অনেকে। কিন্তু কেনো বারবার এমন সংঘর্ষ? যেখানে প্রতিপক্ষ ছাত্রদলের কর্মকাণ্ড নেই, সেখানে কেনো পিস্তল-দা-চাপাতি নিয়ে সংঘর্ষ?

অনুসন্ধানে জানা যায়, এবারের সংঘর্ষের মূল কারণ ছিলো- গত ১ মে সম্পন্ন হওয়া টেন্ডারের ভাগাভাগির ঠিক মতো না হওয়া, হল কমিটি না থাকা এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়াকে দায়ী করেছেন ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে গত বছরের ২৩ অক্টোবর ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পের বড় ধরনের কাজের মধ্যে রয়েছে— ছেলেদের তিনটি ও মেয়েদের তিনটি আবাসিক হল, প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, ছাত্র-ছাত্রীদের খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, আবাসিক কমপ্লেক্স, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, লেকচার থিয়েটার হল ইত্যাদি।

এই প্রকল্পের প্রথম ধাপে ছয়টি আবাসিক হল নির্মাণের জন্য গত ১ মে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিলো। হলগুলো নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। এতে ছয়টি হলের টেন্ডার প্রক্রিয়া ও উদ্বোধন ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এই টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে ছাত্রলীগের অন্তঃকলহ আরো প্রকট হয়ে উঠেছে বলে ছাত্রলীগের সূত্রে জানা যায়।

এর আগে টেন্ডারের দরপত্র কেনার সময় ছাত্রলীগ সভাপতি মো. জুয়েল রানার বিরুদ্ধে ‘মাজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে শিডিউল নিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠেছিলো। যদিও সেসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন সভাপতি মো. জুয়েল রানা।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্যাম্পাসে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন কাজের ভাগ কেন্দ্রিক জটিলতায় জাবি ছাত্রলীগ বারবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রায় নীরব দর্শক হয়ে থাকছে। যথাযথ বিচার’ না হওয়া এবং প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করেছেন তারা। এছাড়া অপরাধের শাস্তি না হওয়ায় ‘কিছুই হয় না’- এমন মনোভাব বিরাজ করছে বলে জানান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ফলে অপরাধ, সংঘর্ষ বাড়ছে। কখনো শুধু ‘তদন্ত কমিটি’ করেই দায় এড়িয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে প্রশাসনের বিরুদ্ধে। কেউ কেউ একে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘চা কমিটি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩ জুলাইয়ের সংঘর্ষের ঘটনায় তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি প্রশাসন। সিন্ডিকেটের জরুরি সভায় অধ্যাপক রাশেদা আখতারকে প্রধান করে শুধুমাত্র পাঁচ-সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দশ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এবারের সংঘর্ষের ঘটনায় প্রশাসন ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মী।

সংঘর্ষের বিষয়ে ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, “পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে প্রশাসনের ভূমিকা ছিলো রহস্যজনক। আর প্রক্টরের আচরণও ছিলো পক্ষপাতিত্বমূলক। প্রশাসন বিন্দুমাত্র থামানোর চেষ্টা করেনি। আড়াই-তিন ঘণ্টার মধ্যে কোনো পুলিশ আসেনি।”

ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদককে উদ্দেশ্য করে সাদ্দাম বলেন, “ওই ঘটনায় জাবি ছাত্রলীগ সভাপতি-সম্পাদকের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। সংঘর্ষ দীর্ঘস্থায়ী করতে ওখানে সাধারণ সম্পাদক নিজে এসে উস্কানি দিয়েছে। গত তিন মাস সে ক্যাম্পাসে ছিলো না। ক্যাম্পাসে এসে প্রক্টরের সঙ্গে মিটিং করেছে। প্রক্টরের সঙ্গে তার সখ্যতা রয়েছে। ক্যাম্পাসে ৪৫০ কোটি টাকার কাজ চলছে, সেখান থেকে বাকিদের মনোযোগ সরাতে এই ঘটনা দীর্ঘ করা হয়েছে। প্রশাসন হয়ত সভাপতি-সম্পাদকের সঙ্গে ডিলিংয়ে গেছে।”

জাবি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তারেক হাসান বলেন, “প্রশাসন একপাক্ষিক আচরণ করেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে। কিন্তু, প্রক্টরের নির্দেশে পুলিশ আমাদের দিকেই টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। প্রশাসনের এরকম পক্ষপাতমূলক আচরণে আমরা ক্ষুব্ধ।”

প্রশাসনের ব্যর্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান বলেন, “গতকালের (৩ জুলাই) ঘটনা অপ্রত্যাশিত। এ ধরণের ঘটনায় অভিযোগ উঠতেই পারে। আমি ঘটনাস্থলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে উপস্থিত হই। আমাদের কাজের কোনো গাফিলতি ছিলো না। কয়েকবার ঘটনা থামানোর চেষ্টা করার পরও ঘটনার পুনরাবৃত্তি রহস্যজনক! আমি কোনো ব্যক্তি বা গ্রুপকে প্রমোট করি না, করবোও না। কেউ আমার কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা চাইবে না, এটাই আমার প্রত্যাশা।”

জাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে গোপন মিটিংয়ের অভিযোগ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আ. স. ম ফিরোজ উল হাসান বলেন, “আমার দরজা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্যই খোলা। যে কেউ আমার কাছে আসতে পারে। আমার দায়িত্ব হলো সাধ্যমতো তাদের সমস্যার সমাধান করা। কিছুদিন আগে সেক্রেটারি (আবু সুফিয়ান চঞ্চল) আমার কাছে আসছিলো উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে। আমি তাকে এ বিষয়ে একটু সহযোগিতা করি। এর বেশি কিছু না। এটাকে যদি ‘গোপন মিটিং’ বলে তাহলে তো ঠিক না। ওই দিন তো আমার কাছে তারেক ও মিজান (ছাত্রলীগ নেতা) আসছিলো। ওরাও তো অনেক সময় ছিলো।’’

উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আ, স, ম, ফিরোজ উল হাসান এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। তার বাড়ি উত্তরবঙ্গে। জাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের বাড়িও উত্তরবঙ্গে হওয়ায় ছাত্রলীগের একাংশ বিভিন্ন সময় প্রক্টরের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগে গ্রুপিংয়ের অভিযোগ আনেন।

সম্মিলিত শিক্ষক সমাজের যুগ্ম আহবায়ক অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস বলেন, “সারাদেশেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। যা অপরাধীদেরকে অপরাধ করতে প্রত্যক্ষ মদদ যোগায়। এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘটিত সংঘর্ষের ঘটনার আজ পর্যন্ত বিচার হয়নি। গতবছরের অক্টোবরে সংঘটিত যৌন হয়রানির ঘটনায় এমনকি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়নি। এই ঘটনাতেও ছাত্রলীগের নাম পত্রিকায় এসেছে। এ ধরনের শৈথিল্য নজির হিসেবে নিন্দনীয়। সংশ্লিষ্ট সকলে এ ধরনের নজির থেকে ভুল বার্তা পান যে, অপরাধ করলেও পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব। ”

ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের অনেক তদন্ত কমিটি হয়। কিন্তু এইসব তদন্তের দীর্ঘ সূত্রিতা রয়েছে। অনেক সময় শিক্ষকরা ব্যস্ততা দেখিয়ে দায়িত্ব নিতে চান না। ইতিমধ্যে যেসব তদন্ত প্রতিবেদন সিন্ডিকেটে এসেছে তা একটি আলাদা সিন্ডিকেট ডেকে আমরা বিচার করবো। তিনি আরো বলেন, ‘হলগুলোতে পুলিশি তল্লাশি চালানোর প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি। এটা আমরা ঘোষণা দিয়ে করবো না। যেকোনো সময় আমরা তল্লাশি চালাবো।’


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ