রুবেল-ফয়সালরা যেভাবে ঢাবির ক্যান্টিনগুলোয় আসে

ছবিতে মো. রুবেল ও  ফয়সাল হোসেন
ছবিতে ফয়সাল হোসেন (ওপরে) ও মো. রুবেল  © টিডিসি ফটো

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যারা অন্য নাম প্রাচ্যের অক্সফোর্ড, বাংলাদেশের জ্ঞানের বাতিঘর। কিন্তু কটূ হলেও সত্য, দেশের সর্বোচ্চ এ বিদ্যাপীঠটিতে নিত্যই যে চিত্র চোখে পড়ছে, তার অন্তত শিক্ষালয় হিসেবে এই প্রতিষ্ঠােনের সঙ্গে একদমই বেমানান। আর তা হলো- প্রায় প্রতিটি হল ও দোকানগুলোর শিশু শ্রমিক। শিক্ষার্থীরা যখন ব্যাগ নিয়ে ক্লাস বের হচ্ছেন, ঠিক তখনই এ শিশুদের ক্যান্টিন কিংবা দোকানের চা আনা-নেওয়ার কাজ করতে হচ্ছে। বাদ যাচ্ছে না টেবিল, প্লেট-গ্লাস এমনকি ক্যান্টিন ধোয়া-মোছার কাজও।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হওয়ায় বাংলাদেশের সবচেয়ে সুশীল লোকগুলোর এখানেই বসবাস। আর তাঁরা নিত্যই এই দৃশ্যগুলি অবলোকন করে থাকেন। অথচ তাঁরা তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না। বাংলাদেশ জাতীয় শ্রম আইন ২০১৮ অনুযায়ী (সংশোধিত) ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের দিয়ে কাজ করানো হলে তা শিশুশ্রমের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। আর কেউ যদি শিশুশ্রমিক নিয়োগ করে তাহলে তার পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হবে। অথচ শিশুশ্রম এখন অতি সাধারণ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানেও ২০১৮ সালের শিশুশ্রম আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনযোগ দেওয়া উচিত।

পত্র-পত্রিকায় শিক্ষার্থীদের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার খবর ছাপানো হলেও এদের গল্পগুলো কখনো ছাপানো হয়না। মে দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন দুইজন শিশু শ্রমিকের কাহিনী তুলে ধরা হলো।

মো. রুবেল : ঢাবির মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ক্যান্টিনে কাজ করে শিশু মো. রুবেল। বয়স বারো তেরো বছরের মত হবে। রুবেল জানায়, তাদের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দায়। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে সে সবার বড়। আগে তারা ময়মনসিংহে থাকতো। বাবা রিকশাচালক আর মা বাড়িতে বাড়িতে কাজ করতেন। কিন্তু একদিন হঠাৎ করে তার মায়ের পেটে টিউমার ধরা পড়ে। টিউমার অপারেশনের জন্য দরকার হয় প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। এত টাকা তার রিকশাচালক বাবার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। এছাড়াও তার নানার বাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থাও তেমন ভালো না।

এ কারণে বাধ্য হয়ে মানুষের কাছে ধার-দেনা করে তার মায়ের টিউমার অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পর মা আর কোনো কাজ করতে পারেন না, বাড়িতে শুয়ে থাকেন। মায়ের অপারেশনের পর রুবেলের পরিবারের উপর নেমে আসে পাওনাদারদের জ্বালাতন। পাওনাদাররা বাড়িতে এসে পাওনা টাকার জন্য চাপ দিতে থাকে। কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে বাধ্য হয়ে রুবেলের পরিবার পাড়ি জমায় ঢাকার সাভারে।

পরিবারের ঋণ পরিশোধ করতে কাজ করে মো. রুবেল

রুবেল তার গ্রামের একটি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র ছিল। ঢাকায় এসে সে তার বাবার সাথে পরিবারের হাল ধরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলের ক্যান্টিনে সে মাসে সাড়ে ৪ হাজার টাকার বিনিময়ে চাকরি শুরু করে।

রুবেল দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলে, আমি এখানে খাবারের উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার, পানি আনাসহ বিভিন্ন কাজ করি। মাঝে মধ্যে সাভারে মা-বাবা ও বোনদের সাথে দেখা করতে যাই। আমি চাই যেকোনো ভাবে আমার পরিবারের যে ঋণ আছে সেটা শোধ করতে।

সে আরো জানায়, সে আবার স্কুলের বন্ধু সোহাগের সাথে গ্রামের মেঠোপথ ধরে হৈ হুল্লোড় করে স্কুলে যেতে চায়। কিন্তু চাইলেই কি সব সম্ভব? তার মাথায় যে দিনরাত শুধু ঋণের চিন্তা ঘুরে। ঋণের চিন্তার নিচে চাপা পড়ে থাকে তার পড়াশোনা করে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন। মুক্ত আকাশে পাখা মেলে উড়ার স্বপ্ন।

ফয়সাল হোসেন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন শিশু শ্রমিক ফয়সাল হোসেন। সে কাজ করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের দোকানে। ছোট্ট মায়াবী চেহারার ফয়সালের বয়স তেরো চৌদ্দর মত হবে।

সে জানায়, তার বাড়ি চাঁদপুরের মতলবে। বাবা অসুস্থ তাই কোনো কাজ করতে পারেন না আর মা নারায়ণগঞ্জে কাজ করেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই ঢাকায় কাজ শিখে, সে বঙ্গবন্ধু হলের দোকানে কাজ করে আর ছোটভাই বাড়িতে পড়াশোনা করে। পড়াশোনা করার ইচ্ছা থাকলেও পরিবারের দারিদ্র্যতা তাকে পঞ্চম শ্রেণি থেকে পড়াশোনার ইতি টেনে ঢাকায় চলে আসতে বাধ্য করে। দেড় বছর যাবত সামান্য বেতনে এ শিশুটি ঢাকায় কাজ করে যাচ্ছে।

বাবার ওষুধ ও ছোট ভাইকে পড়াশোনা করাতে ফয়সালের সংগ্রাম


ফয়সাল দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি আবার আমার আগের জীবনে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু কী করবো? কাজ না করলে তো পরিবার চলবে না, বাবার ওষুধ খরচ ও ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা চলবে না। ফয়সালের স্বপ্ন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বলে, আমি কিছু একটা কাজ করতে চাই যাতে আমার পরিবার সুখে থাকে।

আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, যখন ক্যান্টিনে খেতে যাই তখন এ ছোট্ট শিশুদের কাজ করতে দেখে খুব কষ্ট হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত একটি জায়গায় শিশুরা পড়াশোনা না করে কাজ করছে, এটা খুব দুঃখের বিষয়।

সিয়াম আহমেদ নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, এ শিশুরা যেহেতু পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে এখানে এসে কাজ করছে সেহেতু এদের কাজের পাশাপাশি এখানে কাছের কোনো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। তাদের স্কুলের সময় স্কুলে পাঠানো এবং পড়াশোনার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় দেয়ার জন্য ক্যান্টিন বা দোকান মালিকদের বাধ্য করা যেতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক সমাবেশে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল একবার বলেছিলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য এটাই যে, অর্থনৈতিক বৈষম্যে শিশুদের ‌‌'শ্রমজীবী' হিসেবে পরিচিতি করাতে হচ্ছে। মূলত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সঠিকভাবে কাজ না করায় এই বৈষম্য। বৈষম্যের কারণে ৭৪ লাখ শিশু পড়ালেখা ও নিজস্ব অধিকার পাচ্ছে না।’

কবে মিলবে বৈষম্য থেকে এই দায়মুক্তি? না জানে সুলতানা কামাল আর না জানি আমরা?


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ