আগুন দেয়ার আগ মুহূর্তেও যৌনতার দায় ছিল নুসরাতের!

দেহরক্ষীর হাতে নিহত হওয়ার মধ্যে যেমন বিশ্বাসহানী রয়েছে, তেমনই বিশ্বাসভঙ্গের ব্যাপার আছে আত্মজন বা শিক্ষকের হাতে যৌননিগ্রহের ঘটনায়ও। পূর্বপরিচয় বা সম্মানের জায়গা শিক্ষকতার মাধ্যমে  অর্জিত বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে যারা নারীর প্রতি সহিংসতায় অংশ নেয়; তারা আর যাই হোক মনুষ্য জাতির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না।

বাংলাদেশে নারীদের উপর যে ধরনের যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে তার ৯০শতাংশ ধর্ষণই লোকলজ্জায় কিংবা পরিবারের অমতে গোচরে আনা হয় না। যুগ যুগ ধরে চলে আসা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোয় নারীর প্রতি সহিংসতার কথা প্রকাশ করে আবার পদে পদে লাঞ্চিত ও অপমানিত হতে হয় নারীকে। ঠিক একই ধরণের ঘটনা ঘটেছে সোনাগাজী নুসরাত জাহান রাফির ক্ষেত্রেও।

২০১৭ সালে বখাটে কর্তৃক ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে তার কারো থেকে সহানুভূতি পায়নি নুসরাত। বরং বিভিন্ন ধরণের রংচঙে এ ঘটনাকে পত্রিকার পাতার শিরোনাম করা হয়েছে। রক্ষণশীল সমাজে এসব সংবাদ নুসরাতের জন্য সুখকর হয়নি।

আবার মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল কর্তৃক যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েও কারো সহানুভূতি পায়নি সে। উল্টো তাকে খারাপ মেয়ে অপবাদ দেয়ার জন্য বিভিন্ন রকম গুজব ছড়ানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, সে সময় যৌন নিগ্রহের পুরো দায়  নুসরাতের ওপর চাপানো হয়েছিল। পাশাপাশি নিপীড়ক সিরাজ উদ দৌলার মুক্তির দাবিতে সোনাগাজীতে হয়েছিলো বিশাল মানববন্ধন।

জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকার শিরোনাম হয়েছিলো নুসরাত। এসব প্রতিবেদনের খবর ছিলো প্রেম প্রস্তাবে সাড়া না দেয়ায় নুসরাত জাহান রাফির নামে এক দাখিল পরীক্ষার্থীর চোখে চুন জাতীয় দাহ্য পদার্থ ছুড়ে মেরেছে বখাটেরা। অথচ নুসরাত বা তার পরিবার জানতোই না কারা তাকে চুন মিশ্রিত পানি মেরে পালিয়ে যায়। এ ঘটনার পর থেকেই হুজুগে মানুষ ও অপরাধীদের লোলুপ দৃষ্টি নুসরাতের উপর।

এ ধরণের ঘটনার পরও নুসরাত দাখিল পরীক্ষায় পাস করে আলিমে পড়াশুনা শুরু করেন। সোনাগাজী সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর স্থানীয় বখাটেদের পাশাপাশি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দ্দৌলাও প্রথম বর্ষ থেকে তার প্রতি লোলুপ দৃষ্টি দিতেন। ২০১৭ সালের ঘটনাকে পুঁজি করে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা তাকে বলত, ‘ওটা তো তোর লাইফে কলঙ্ক হয়ে গেছে। তোকে আর কেউ বিশ্বাস করবে না। তোর লাইফে তো আগে একটা কলঙ্ক আছে। তুই আমার সঙ্গে থাক।’

মৃত্যুর আগে জবানবন্দিতে নুসরাত বলে যায়, ‘আমার একটা অ্যাকসিডেন্ট হইছে, কেউ একজন আমাকে চুন মারছে। চুনগুলো আমার চোখে পড়ছিল। সেটা নিয়ে নিউজ হইছিল। উনিও ওইটার সুযোগ নিছেন।’

গত ২৭ মার্চ নুসরাতকে নিজ কক্ষে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন সিরাজউদ্দৌলা। তার মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে ওইদিন পুলিশ সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার করে। সিরাজ উদ দৌলা গ্রেফতার হলেও সহপাঠী বা মাদ্রাসার অন্য কেউ নুসরাতের পাশে দাঁড়ায়নি। বরং তারা সিরাজ উদ দৌলাকে মুক্তির জন্য কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি নুসরাতকেও বিভিন্নভাবে চাপ দিতে থাকেন।

নুসরাতের উপর এমন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও তার গায়ে আগুন দেয়ার আগ পর্যন্ত কেন কেউ নুসরাতের পাশে দাঁড়ায়নি তা নিয়ে অনুসন্ধান চালায় ‘দ্যা ডেইলি ক্যাপাস’। বিষয়টি জানতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নুসরাতের ঘনিষ্ঠ ও সহপাঠীদের সাথে কথা হয় আমাদের।

নুসরাতকে হেনস্তা চেষ্টার অভিযোগে ২৭ মার্চ গ্রেফতারের পরদিন থেকেই সিরাজ উদ দৌলার মুক্তির আন্দোলন শুরু করে একদল শিক্ষার্থী। মাদ্রাসার ছাত্রলীগ সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম, সিরাজের অপকর্মের সহযোগী নুর উদ্দিন জোর করে শিক্ষার্থীদের এসব কর্মসূচিতে যোগ দিতে বাধ্য করেছেন। আলিম ১ম বর্ষের কর্মসূচিতে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের একজন বলেন, আমাদের আলিম ১ম বর্ষের কেউ আমরা সিরাজ উদ দৌলার মুক্তির জন্য আন্দোলনে যেতে চাইনি। তারা আমাদেরকে জোর করে নিয়ে যেতে চায় এবং শামীম ও নুর উদ্দিন বলে গায়ে হাত দিছে ধর্ষণতো আর করে নাই।

অন্যদিকে কর্মসূচিতে যোগ দেওয়াদের একটি বড় অংশ সিরাজের অপকর্মের সহযোগী। শিক্ষার্থীরা বলেন, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা প্রত্যেক পাবলিক পরীক্ষার আগে তার ঘনিষ্ঠ ও অপকর্মের সহযোগী ছাত্রদের প্রশ্ন দিয়ে দেন। আলিম পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে তার গ্রেফতার হওয়াতে পরীক্ষায় প্রশ্ন পেতে তাদের অনিশ্চয়তা তৈরী হয়। তাই তারা চাচ্ছিলেন দ্রুত সিরাজকে মুক্ত করে আনতে।

মাদ্রাসার একজন শিক্ষক বলেন, সিরাজ উদ দৌলা কিছু সাবেক ও বর্তমান ছাত্রদের নিয়ে সব ধরণের অপকর্ম করে। তাই তাকে  কেউ কিছু বলার সাহস পায়না। নুসরাতের সাথে ঘটে যাওয়া ২৭ তারিখের ঘটনার পর আমরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে শুরু করি। কিন্তু পরবর্তীতে মাদ্রাসার গভর্নিং বোর্ডের সহসভাপতি ও উপজেলা আওয়ামিলীগ সভাপতি রুহুল আমীন আমাদেরকে বিষয়টি নিয়ে কথা না বলতে পরোক্ষভাবে হুমকি দেন। আর আমাদেরও ধারণা ছিলো যেহেতু নুসরাতের গায়ে হাত দিয়েছে তাই অল্প কিছু দিন পরেই সিরাজ উদ দৌলা ছাড়া পেয়ে যাবে। তখন আমাদের চাকরি থাকবে না।

গত ৬ এপ্রিল কৌশলে ছাদে ডেকে নিয়ে গিয়ে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করা নুসরাত জাহান রাফিকে। এরপর ঘটনা ধামাচাপা দিতে স্থানীয় ওসি, সাংবাদিক থেকে করে প্রভাবশালীরা এটাকে আত্মহত্যা বলে চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১১এপ্রিল বুধবার মারা যায় নুসরাত। 


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ