আওয়ামী লীগের ‘প্রত্যয়নপত্র’ নিয়ে হত্যা মামলা থেকে রেহাই পান লুপা

আওয়ামী লীগের ‘প্রত্যয়নপত্র’ নিয়ে হত্যা মামলা থেকে রেহাই পান লুপা
  © ফাইল ফটো

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসি এলাকা থেকে পথশিশু জিনিয়াকে (৯) অপহরণকারী লুপা তালুকদার নিজেকে আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য বলে পরিচয় দিতেন। এই পরিচয় দিয়েই প্রত্যয়নপত্র দিয়ে হত্যা মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন তিনি। পটুয়াখালীর গলাচিপায় গৃহকর্মী শাহিনুর ও শিশুকন্যা সেলিনাকে (৫) হত্যার মামলাটি থেকে রাজনৈতিক বিবেচনায় অব্যাহতি পেয়েছিলেন তিনি।

জানা গেছে, রাজনৈতিক মামলা হিসেবে বিবেচনার জন্য লুপা তালুকদার ও তার পরিবারের সদস্যরা জাল প্রত্যয়নপত্র তৈরি করেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম ব্যবহার করে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রত্যায়িত করেন তারা। এরপর মামলার অভিযোগপত্রের আসামি হিসেবে লুপা তালুকদার, তার বাবা হাবিবুর রহমান নান্না মিয়া তালুকদার, ভাই লিটন ও লিকন তালুকদার অব্যাহতি পেয়েছিলেন। এমন দাবি করেছেন গলাচিপার স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা।

গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের তখনকার সভাপতি হারুন অর রশীদ বলেন, লুপা তালুকদার ও তার পরিবারের সদস্যদের আওয়ামী লীগের কোনো প্রত্যয়নপত্র দেননি তারা। তারা তাদের নাম ব্যবহার করে জাল প্রত্যয়নপত্র তৈরি করা হয়েছে। খবর পাওয়ার পর গলাচিপা থানায় এ বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তিনি।

তবে লুপা তালুকদারের বড় ভাই মোস্তাইনুর রহমান লিকন তালুকদার বলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের তখনকার সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র নিয়েছিলেন তারা। এখন জমি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে তারা মিথ্যা কথা বলছেন বলেও দাবি তার।

স্থানীয়দের ভাষ্য, লুপার বাবা হাবিবুর রহমান ছিলেন চিহ্নিত রাজাকার। পটুয়াখালী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের রাজাকারের তালিকায় ১১ নম্বরে তার নাম রয়েছে। ওই পরিবারের আরও দুজন রাজাকার ছিলেন। এ তথ্য সবাই জানেন। তারপরও আওয়ামী লীগ নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে আওয়ামী লীগের পরিবারের সদস্য ও নেতাকর্মী হিসেবে প্রত্যয়নপত্র নিয়েছিলেন হত্যা মামলা থেকে বাঁচার জন্য।

রাজধানী শাহবাগ থানার অপহরণ মামলায় সম্প্রতি লুপা তালুকদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপর তার পরিবারের অপকর্মের খবর প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডও ফাঁস হয়। এজন্যই নতুন করে জিডি করেছেন তারা। লুপা তালুকদার বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

লিকন তালুকদার বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতারা মিথ্যা কথা বলছেন। তৎকালীন সভাপতি হারুন অর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা টিটো ও সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনির স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ছোট ভাই প্রয়াত লিটুন তালুকদার গলাচিপা ঘাট শ্রমিক লীগের সভাপতি ছিলেন। লুপা ছাত্রলীগ করেছে।’

জানা গেছে, ২০০৩ সালে গলাচিপায় লুপা বেগম, তার বাবা ও দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়। শাহিনুর নামে এক গৃহকর্মীকে লুপার স্বামী ও ভাই মিলে তাকে নিয়মিত যৌন নিপীড়ন করতেন বলে অভিযোগ করতেন। পরে শাহিনুর অন্তঃসত্ত্বা হলে বিষয়টি জানাজানি হয়। এরপর শাহিনূর ও তার পাঁচ বছর বয়সী কন্যাকে অপহরণ করে হত্যার পর নদীতে ফেলে দেয় লাশ। এর তদন্তে লুপা, লুপার বাবা, দুই ভাই, লুপার স্বামী রফিকুল ইসলাম বাদলসহ বেশ কয়েকজনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ।

পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে নিজেদের আওয়ামী লীগ পরিবার হিসেবে প্রচার করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন অধিশাখা-১-এর উপসচিব মো. মিজানুর রহমান গলাচিপা থানার ওই মামলায় তাদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন না চালানোর সিদ্ধান্তের কথা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানিয়ে দেন। এ ঘটনায় একাধিক আসামির সাজার রায় হলেও লুপা ও তার পরিবারের সদস্যরা অব্যাহতি পান।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ