পঞ্চম-অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়া নয়ন যেভাবে সন্ত্রাসী

সাব্বির আহমেদ নয়ন থেকে বনে যায় ‘নয়ন বন্ড’। যদিও ছোটবেলা থেকে পড়াশোনায় ছিলেন মনোযোগী এবং মেধার স্বাক্ষরও রাখেন। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে ধারাবাহিকভাবে পান সরকারি বৃত্তি। বাবাও ছিলেন একজন ব্যাংকার। তাহলে পড়াশোনার জগৎ থেকে কীভাবে বনে যান ফিল্মের মানুষ হত্যার নায়ক— এর জবাবও বরগুনার মানুষের মুখেমুখে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও কিছু পুলিশ কর্মকর্তার আশ্রয়ে অপরাধই তার নেশাতে পরিণত হয়।

ক্রসফায়ারে ছেলের মৃত্যুতে শোকাহত স্বামী হারা শাহিদা বেগম। ছোটকালে তার ছেলে ছিল সোনার টুকরা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, এই ছেলেই হয়ে যান বরগুনা শহরের আতংকের নাম। তিনি জানান, ‘নয়ন ছোটবেলায় ভালো ছাত্র ছিলেন। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা। ২০০৭ সালে বাবার মৃত্যুর পর লেখাপড়ায় মনোযোগ কমে যায় তাঁর।’

শাহিদা আক্তার বলেন, নয়ন তো এক দিনে ‘নয়ন বন্ড’ হননি। প্রভাবশালী মহল তাঁকে ব্যবহার করার জন্য ‘নয়ন বন্ড’ হিসেবে তৈরি করেছে। তবে প্রভাবশালী মহল ​কারা, সে সম্পর্কে শাহিদা বেগম কিছু বলেননি।

অপরাধ জগতে প্রবেশ: বাবার মৃত্যুর ও প্রেমে বিচ্ছেদ হয়ে অপরাধে জড়িত হন বলে জানান নয়নের একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নূর হোসেন। তিনি বলেন, বাবার মৃত্যুর কিছুদিন পর প্রেমে বিচ্ছেদ হয়, এরপর নয়ন গাঁজা সেবন শুরু করেন। ২০১১ সালে মাধ্যমিক পেরোনোর আগেই সে ইয়াবা ও হেরোইনে আসক্ত হয়ে পড়ে। তখন মাদকের টাকা জোগাতে মানুষের মুঠোফোন, গয়না ছিনিয়ে নেয়ার মতো ছিঁচকে অপরাধ শুরু করেন।

মাদকের টাকার জন্য নয়নের এমন অপরাধ দিন দিন বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগে পাঁচটি মামলা হয়। ভুক্তভোগীরা তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির কাছে নয়নের বিষয়ে অভিযোগ করতে শুরু করেন। নয়নও তখন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজতে শুরু করেন। একপর্যায়ে জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মুরাদ হোসেইনের হাত ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

নয়নের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর সুনাম দেবনাথ এবং তাঁর চাচাতো শ্যালক শাওন তালুকদার ও অভিজিৎ তালুকদারের সঙ্গে নয়নের সখ্য গড়ে ওঠে। অভিজিৎ ও নয়ন একসঙ্গে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। তখন বিভিন্ন ছাত্রাবাসে গিয়ে ছাত্রদের কাছ থেকে মুঠোফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেয়া, চাঁদাবাজি ও মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেয়া ছিল তাঁদের নিয়মিত কাজ।তবে সুনাম দেবনাথ বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

বরগুনা শহরে সাধারণ লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নয়ন বন্ডের ক্ষমতার উৎস শহরের কারও কাছেই অজানা নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা সমাবেশে নয়নকে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে দেখা গেছে। বখাটে নয়নকে নষ্ট রাজনীতিতে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন অসাধু রাজনীতিকরা।

হলিউডের নায়ক বনে যাওয়া: হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা ‘০০৭ লাইসেন্স’র নায়কের নামানুসারে নিজের নামের সঙ্গে ‘বন্ড’ যুক্ত করেন নয়ন। এর পর সিনেমাটির গল্পের আদলে গড়ে তোলেন সন্ত্রাসী বাহিনী। নয়নের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, নয়নের ঘরে সাদা দেয়ালে লাল রঙ দিয়ে এক জায়গায় লেখা ০০৭ (নয়নের সন্ত্রাসী গ্রুপের সাংকেতিক নাম)। ‘০০৭ লাইসেন্স’ একটি বিখ্যাত হলিউড সিনেমা সিরিজ। সিনেমার মৌলিক গল্প অনুযায়ী ০০৭ হচ্ছে মানুষ হত্যার লাইসেন্স। এতে যিনি নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন, তার নাম জেমস বন্ড।

স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, এই ছবি দেখে নয়ন বিশেষভাবে প্রভাবিত হন। এর পর নিজেকে ‘০০৭ লাইসেন্স’ সিনেমার নায়ক ভাবতে শুরু করেন। একপর্যায়ে নিজের নামের সঙ্গে নিজেই যুক্ত করে দেন ‘বন্ড’ শব্দটি এবং একই সঙ্গে গড়ে তোলেন ০০৭ নামের সন্ত্রাসী বাহিনী। এই বাহিনী নয়নের হুকুমে চলত। তার নির্দেশমত অপকর্ম করে বেড়াত।

পুলিশের সঙ্গে ছিল নয়নের নিত্য উঠাবসা। শহরের বাসিন্দারা এমনও বলছেন, নয়ন চাইলে যে কাউকে পুলিশ দিয়ে হয়রানি বা গ্রেফতার করাতে পারত। নয়ন কাজ করত পুলিশের বিশ্বস্ত সোর্স হিসেবে।

কত নারীর সর্বনাশ: সন্ত্রাসের পাশাপাশি নারী নেশায় বুঁদ ছিল নয়ন। নয়ন বন্ডের হাতে ঠিক কতজন তরুণীর সর্বনাশ হয়েছে তার সঠিক হিসাব নেই পুলিশের কাছেও। তবে নয়নের ‘বিশেষ কক্ষ’ থেকে উদ্ধার একটি ল্যাপটপে বহু পর্নো ভিডিও পাওয়া গেছে। কয়েকটি আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি পর্নো ভিডিওতে নয়ন বন্ডের সঙ্গে একাধিক তরুণীর বিশেষ মহূর্তের দৃশ্য রয়েছে। একেক দিন একেক তরুণী নিয়ে সে যে ফুর্তিতে মেতে উঠেছিল তা স্পষ্ট।

পুলিশের সূত্র বলছে, নয়ন বন্ডের ওই বিশেষ কক্ষের গোপন জায়গায় সুকৌশলে আইপি ক্যামেরা (ইন্টারনেট ক্যামেরা) বসানো থাকত। বিশেষ উদ্দেশে নয়ন বন্ড যাদের ওই কক্ষে আনতেন তারা কেউ ক্যামেরার অস্তিত্ব টের পেতেন না। একবার নয়নের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়ার পর ওই মেয়ের আর রক্ষা ছিল না। ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে বারবার কিশোরী- তরুণীদের ব্যবহার করত সে। অনেক তরুণী নয়নের হাত থেকে বাঁচতে কলেজ ছাড়তে পর্যন্ত বাধ্য হয়েছেন।

অনেকে আবার নয়নের চাহিদামতো মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। পুলিশের হাতে এমন অন্তত ১২ জন তরুণীর তথ্য আছে বলে জানা গেছে। নয়ন কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কে বা কারা এসব ভিডিও ছড়াচ্ছে তার সন্ধান করতে পারেনি পুলিশ।

পুলিশের সঙ্গে নয়ন বন্ডের সখ্যতা: নয়নের বাড়ির মূল দরজার পাশেই একটা ছোট্ট বৈঠক ঘর। নয়ন সেখানেই থাকত। গভীর রাত পর্যন্ত ঘরের দরজা খোলা থাকত। সারা দিন এখানে-সেখানে ঘোরাঘুরির পর গভীর রাতে বাড়ি ফিরত। রাত ১২টার পর তার কক্ষে লোকজনের আনাগোনা বেড়ে যেত। আসতেন পুলিশের সদস্যরাও। প্রতিবেশীরা বলছেন, পুলিশের কয়েকজন অসাধু সদস্য মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারা নয়নকে ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা চালিয়ে গেছেন। শহরের অনেকেই মাদকের সঙ্গে যুক্ত ওই পুলিশ কর্মকর্তাদের চেনেন- জানেন। কিন্তু কেউ-ই মুখ খুলতে নারাজ।

শহরের বাজার রোডের আরেক বাসিন্দা বলেন, নয়নের মনোরঞ্জনে ব্যবহৃত অনেক তরুণীকে পরে পুলিশের মনোরঞ্জনে ব্যবহৃত হওয়ার কথা শোনা গেছে। বিনিময়ে পুলিশের উদ্ধার করা মাদকের ভাগ পেত নয়ন।

বরগুনা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, নয়নের শোবার ঘর থেকে যে ল্যাপটপটি উদ্ধার করা হয়েছে সেখানে কয়েকশ’ নীল ফিল্ম রয়েছে। স্থানীয় অনেক তরুণী যে তার শিকারে পরিণত হয়েছেন ল্যাপটপের ওই ভিডিও-ই তার প্রমাণ। জেলা পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এসব ভিডিও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন।

নয়ন বন্ড কিছু পুলিশ কর্মকর্তার সোর্স ছিলেন—এমন তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, ‘সোর্সিং বিষয়টা গোপনীয়। কার সোর্স কে, সে বিষয়ে কর্মকর্তারা বলতে বাধ্য নন। এটা আইন দ্বারাই সিদ্ধ।’

পুলিশ সুপার এ বিষয়ে পরিষ্কার জবাব না দিলেও নয়নের মা শাহিদা আক্তার বলেন, তাঁর ছেলের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ ছিল। এর মধ্যে ২০১৭ সালে তখনকার টাউন দারোগা নিয়মিত নয়নের কাছে তাঁর বাসায় আসতেন।


সর্বশেষ সংবাদ