মেয়ের সঙ্গে বাবার ছিনিমিনি, ক্রাইম প্যাট্রোলকেও হার মানাচ্ছে খুশির গল্প!

  © সংগৃহীত

সাত বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল খুশি আরা আক্তার। অবশেষে তাকে খুঁজে পেয়েছে গুলশান থানা পুলিশ। এখন আদালতের মাধ্যমে খুশিকে বাবা আজিজার রহমানের কাছে ফেরত দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে এখন তার বাবার কর্মকাণ্ড নিয়ে তৈরি হয়েছে বিপত্তি।

দিনাজপুরের খানসামা থানার পাকেরহাট গ্রামের আজিজার রহমানের মেয়ে খুশি। ২০১২ সালে গুলশানের নিকেতনের বি ব্লকের ৯১ নম্বর বাড়িতে এ/৩ ফ্ল্যাটে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করে সে। তখন তার বয়স ছিল ১১ বছর। এক বছর পর ২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বের হয়ে হারিয়ে যায় খুশি।

এ ঘটনায় খুশির বাবা দিনাজপুরের আদালতে গৃহকর্তা মাসুদুজ্জামান ও তার স্ত্রী শওকত আরা বেগম শিউলী, সৈয়দ আলী শাহ এবং তার গাড়ি চালক খগেন্দ্র নাথ রায়কে আসামি করে মামলা দায়ের করে।

মামলাটির তদন্তভার পুলিশ ও পিবিআইয়ের হাত থেকে সিআইডিতে ন্যস্ত হয়। এরইমধ্যে গুলশান থানা পুলিশ খবর পায়, হারিয়ে যাওয়া খুশি কড়াইল বস্তিতে থাকে। পুলিশ বস্তির বউ বাজারের খোকনের বাসা হতে তাকে উদ্ধার করে। তার এখন বয়স ১৯ বছর।

গত পহেলা জুলাই খুশিকে উদ্ধার করে গুলশান থানা পুলিশ। তবে এরপরই শুরু হয় বিপত্তি। মেয়েকে দেখে দৌড়ে পালান বাবা আজিজার। পুলিশের দাবি, কিছু অর্থের জন্য মামলা লড়েছেন তিনি। এখন মেয়ে ফেরত আসায় তার দায়িত্ব নিতে চান না আজিজার। আদালতের নির্দেশে তাই এখন খুশির ঠিকানা হয়েছে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে। দীর্ঘ সাত বছর পর খুশির এমন উদ্ধারের ঘটনাটি ভারতীয় টিভি সিরিয়াল ক্রাইম প্যাট্রোলকেও যেন হার মানিয়েছে।

জানা গেছে, সৈয়দ শুকুর আলী নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে খুশিকে বাসায় নিয়ে আসেন মাসুদুজ্জামান। ভালোভাবেই কাজ করছিল সে, পরিবারের সদস্যরাও তাকে আপন করে নিয়েছিলেন। এক বছর পর ২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয় খুশি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য বাসার নিচে নামার পর সে নিখোঁজ হয়। সন্ধান করে খুশিকে না পেয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর সাধারণ ডায়েরি করেন মাসুদুজ্জামান। এছাড়া পত্রিকায় নিখোঁজের বিজ্ঞপ্তি ছাপান তিনি।

এরই মাঝে মামলা করেন খুশির বাবা আজিজার। আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় খানসামা থানাকে। ২০১৪ সালে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করলে আজিজার রহমান তাতে নারাজি দেন। এরপর আদালত অধিকতর তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন পিবিআইকে। পিবিআইও অধিকতর তদন্ত শেষে রিপোর্ট দাখিল করেন। এতেও সন্তুষ্ট না হতে পেরে নারাজি দিলে আদালত পুনরায় তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দিলে তা তদন্তাধীন রয়েছে।

এভাবে তদন্ত চলার এক পর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে, খুশি কড়াইল বস্তিতে বসবাস করছেন। পুলিশ গোপনে যোগাযোগ করে ওই খুশিই হারিয়ে যাওয়া শিশু বলে নিশ্চিত হন। এরপর পহেলা জুলাই মাসুদুজ্জামানের স্ত্রী শওকত আরা বেগম শিউলীকে নিয়ে খুশিকে উদ্ধার করেন গুলশান থানার এসআই মো. আনোয়ার হোসেন খান। গুলশান থানার পক্ষ থেকে মামলার সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা দিনাজপুরের এসআই জাবিরুল ইসলামকে বিষয়টি জানানো হয়।

খুশি জানায়, ২০১৩ সালে নিকেতনের ওই বাসা থেকে বের হয়ে সে পথ হারিয়ে ফেলে। হাঁটতে হাঁটতে গুলশানের গুদারাঘাটে রাস্তার পাশে বসে কাঁদতে থাকে। তখন ডিসিসি মার্কেটের ক্লিনার মনোয়ারা বেগম (খোকনের মা) তাকে দেখে নাম-ঠিকানা জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু খুশি নাম ছাড়া আর কিছুই বলতে পারেনি। মনোয়ারা বেগম তখন তাকে কড়াইল বস্তিতে নিয়ে যান। সেখানেই মনোয়ারা খুশিকে লালন পালন করেন।

দিনাজপুর সিআইডির এসআই জাবিরুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর খুশিকে তার বাবার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু খুশির বাবা দেখে দৌড়ে পালায়। সে মেয়েকে গ্রহণ করবে না বলে জানায়। এরপর খুশিকে আদালতে তোলা হলে তার পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তাকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠায়। বর্তমানে খুশি সেখানেই অবস্থান করছেন।

তিনি বলেন, খুশি হারিয়ে যাওয়ার পর মাসুদুজ্জামানের পরিবার থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে আসছিলেন আজিজার। মামলা নিষ্পত্তির জন্য মোটা অঙ্কের টাকাও দাবি করছিলেন। আজিজার মোট চারটি বিয়ে করেছেন। তবে তার সঙ্গে এখন কেউ বসবাস করে না। একমাত্র ছেলে বিয়ে করে অন্ জায়গায় চলে গেছে। বিয়ের বয়সি মেয়েকে নিয়ে তিনি নতুন বিপদে জড়াতে চান বলে ধারণা করা হচ্ছে।


মন্তব্য