সিলেটের বিশ্বনাথে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে ‘বাতিঘর’

‘সময়ের শৈল্পিক প্রজ্জলন’ স্লোগান বাতিঘরের যাত্রা ২০১১ সালে

সিলেটের বিশ্বনাথে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সংগঠন বাতিঘর শিক্ষা ও সমাজ-উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর বারোজন অধ্যয়নরত ছাত্রের উদ্যোগে ‘সময়ের শৈল্পিক প্রজ্জলন’ স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু হওয়া বাতিঘর এখন প্রতিনিয়ত বিশ্বনাথের সচেতন মহলের প্রশংসা কুড়াচ্ছে।

যাত্রার শুরু থেকেই বাতিঘর সিলেটের শিক্ষা-উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে বই পাঠে উৎসাহিত করতে নানা কার্যক্রম হাতে নেয় বাতিঘর। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিশ্বনাথের রাজাগঞ্জ বাজারে যাত্রা শুরু করে ‘বাতিঘর পাঠাগার’ নামে একটি সুপরিসর পাঠাগার। ২৮০টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু করে এ পাঠাগার, যা বর্তমানে এসে দাঁড়িয়েছে ৪১০০ টি-তে । ৪ টি মাসিক ম্যাগাজিন ও ৪ টি দৈনিক পত্রিকা নিয়মিত রাখা হয় এখানে। ‘বাতিঘর পাঠাগার’ এর নিবন্ধিত পাঠকের সংখ্যা এখন পাঁচশরও অধিক। প্রতিদিন দুপুর ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাঠকের ভীড় থাকে এখানে।

পাঠাগার সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্বনাথ উপজেলায় বিনামূল্যে বই আদান-প্রদান করা যায় এমন সচল পাঠাগারের সংখ্যা খুব একটা বেশি না হওয়ায় বেশ ভালো সংখ্যক পাঠকের পদচারণা এখানে লক্ষ্য করা যায়। বাতিঘর পাঠাগারে শিশুদের পড়াশুনা ও বিনোদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এবছর ৩১মে থেকে বাতিঘর পাঠাগারে খোলা হয়েছে বাতিঘর শিশু কর্ণার। শিশু কর্ণারে শিশু-কিশোররা যেমন বই পড়তে পারছে একই সাথে ভিডিও দেখা, গেইম খেলাসহ নানারকম বিনোদনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নেও বাতিঘর প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে।

বাতিঘরের প্রাণ ক্ষুদে শিশুরা

 

দরিদ্র পরিবারের যেসব শিশুদের বাসায় পড়াশুনায় সাহায্য করার মতো যোগ্য লোক নেই, সেসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াশুনায় সাহায্য করা ও শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের লক্ষ্যে এ বছর ২৬ এপ্রিল থেকে চালু হয়েছে ‘বাতিঘর পাঠশালা’। বিশ্বনাথের বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণীর ৭৫ শিশুকে বাতিঘর পাঠশালায় নিয়মিত পাঠদান করা হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় উৎসাহিত করতে সংগঠনের সূচনালগ্ন থেকে প্রদান করা হয় বাতিঘর শিক্ষাবৃত্তি। একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বাছাই করে বাতিঘর শিক্ষাবৃত্তি প্রদান একসময় বাতিঘর এর নিয়মিত কার্যক্রম হলেও বিভিন্ন জটিলতায় তা আপাতত বন্ধ রয়েছে। বাতিঘর এর দায়িত্বশীলরা শিক্ষাবৃত্তি পুনরায় চালু করার ব্যাপারে কাজ করছেন বলে জানান।

স্বেচ্ছায় রক্তদান এবং বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় বাতিঘর এর নিয়মিত কার্যক্রমের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রায়শই রক্তের জন্য মানুষ দৌঁড়ঝাপ করেন, সঠিক সময়ে রক্ত পান না কিংবা অনেকেই নিজেদের রক্তের গ্রুপ জানেন না। সে কথা চিন্তা করে বাতিঘর নিয়মিত বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ক্যাম্পেইন করে আসছে। ৫টি ক্যাম্পেইন এর মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৮০০ মানুষের রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করার পাশাপাশি ‘বাতিঘর ব্লাড ডোনার গ্রুপ’ এর ৪২৮ জন সদস্যের মাধ্যমে প্রায় ১৬০০ রোগীকে স্বেচ্ছায় রক্তদান করেছেন। শুধুমাত্র ২০১৮ সালে পাঁচশোর অধিক রোগিকে স্বেচ্ছায় রক্ত দেওয়া হয়েছে।

পাঠাগার, শিশু কর্ণার, পাঠশালা এবং রক্তদান এর পাশাপাশি চলছে বাতিঘর এর ক্যারিয়ার কাউন্সিলিং কার্যক্রমও। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে চলে আসা এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বাতিঘর ইতোমধ্যেই বিভিন্ন শিরোনামে ১৩টি ক্যারিয়ার কাউন্সিলিং সেমিনারের আয়োজন করেছে। এসব সেমিনারে অংশ নিয়েছে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার বিভিন্ন স্তরের প্রায় ৩২০০ শিক্ষার্থী। আনুষ্ঠানিক সেমিনারের পাশাপাশি বাতিঘর সদস্যরা প্রতিভাবান শিক্ষার্থীদের ব্যাক্তিগতভাবেও দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন, সময়ে সময়ে নিজেদের মাঝে আয়োজন করছেন ঘরোয়া ক্যারিয়ার আড্ডার। ক্যারিয়ার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগের দক্ষতা বৃদ্ধি, সৃজনশীলতা চর্চা এবং বক্তব্য চর্চার জন্য প্রতি শুক্রবারে বাতিঘর পাঠাগারে বিশেষ কর্মশালা দীর্ঘদিন ধরে চলমান আছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভাষা, দেশ ও ধর্মের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার লক্ষ্যে বাতিঘর আড়ম্বরের সাথে জাতীয় ও ধর্মীয় দিবসগুলো পালন করে আসছে।

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন, উপস্থিত সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা -এসো মুক্তিযুদ্ধকে জানি' এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভিত্তিক আলোচনা সভার আয়োজন বাতিঘরের নিয়মিত কার্যক্রম। এছাড়াও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রক্তদান এবং বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, মহান স্বাধীনতা দিবসে বাতিঘর চিত্রাঙ্কণ প্রতিযোগিতা ও আলোচনা সভার আয়োজন করে। মহান বদর দিবস উপলক্ষে আয়োজন হয় ইফতার মাহফিলের।

স্বেচ্ছাসেবামূলক এই সংগঠনের বর্তমান সদস্য ৩০-এর অধিক

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ও বাতিঘর’র স্থায়ী পরিষদ সদস্য মোঃ মারুফ হোসাইন জানান, শুরুর দিকে বাতিঘর এর কার্যক্রম শুধুমাত্র খাজাঞ্চি ইউনিয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে বাতিঘর তাঁর কার্যক্রম বিশ্বনাথ উপজেলা ব্যাপী ছড়িয়ে দিতে সফল হয়েছে। বিশেষত রক্তদান এবং পাঠাগারের মাধ্যমে বাতিঘর বিশ্বনাথ উপজেলার বাইরের মানুষকেও সেবা পৌছে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবামূলক এই সংগঠনের বর্তমান সদস্য ৩০জনেরও বেশি। এছাড়াও বিভিন্নভাবে এর সাথে সম্পৃক্ত আছেন এলাকার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার শতাধিক মানুষ।

এত কার্যক্রম পরিচালনা নিশ্চয়ই অনেক খরচ সাপেক্ষ, বাতিঘর সে খরচটা কোথা থেকে পাচ্ছে এমন এক প্রশ্নের জবাবে বাতিঘর সভাপতি মোঃ ইমাদ উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক জানান, শুরুর দিকে কেবল সদস্যদের চাদায় কার্যক্রম চালালেও বর্তমানে বাতিঘর বিশ্বনাথের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে এখন সদস্যদের চাদার পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সহযোগিতায় বাতিঘর কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ