শাহবাগের গণগ্রন্থাগারে অন্যরকম ভিড়

ভোর সাড়ে ৬টা। সড়কে লোকজনের উপস্থিতি কম থাকলেও রাজধনীর শাহবাগ মোড়ে ভিন্ন চিত্র। জাতীয় যাদুঘরের পাশেই সুফিয়া কামাল গণগ্রন্থাগার। প্রধান ফটকের গ্রিলে ঝুলছে ব্যাগ। একটার পর একটা ব্যাগ সাজানো। না এটা কোন ব্যাগের দোকান না। সুরক্ষা দেয়াল। পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন শ’খানেক যুবক-যুবতী। তাদের হাতে গাইড বই কিংবা শিট। পড়ছেন। আবার কেউবা চায়ের আড্ডায় মেতে উঠেছেন।

সকাল ৯টার অপেক্ষায় সবাই। কারণ ৯টার সময়ই খুলবে লাইব্রেরির দরজা। আর এতো সকালে আসার কারণ লাইব্রেরিতে জায়গা পাওয়া। সকাল ৯টা বাজার ১০ থেকে ১৫ মিনিট আগেই একে একে ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে পড়েন। এবার ভিতরে প্রবেশের পালা। সারিবদ্ধভাবে প্রবেশ করছেন সবাই। ভিতরে প্রবেশ করেই সুশৃঙ্খলভাবে রাখছেন নিজেদের ব্যাগ। কারণ গ্রন্থাগারের ভিতরে নেই ব্যাগ নিয়ে প্রবেশের সুযোগ। এরপর তারা ব্যাগের বিপরীতে পান একটি টোকেন। তারা সঙ্গে নেন প্রয়োজনীয় খাতা, কলম, পানির বোতল ইত্যাদি।

আরও পড়ুন: ‘উন্নত বিশ্বে গ্রন্থাগারের কদর অনেক বেশি’

দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ১২০টি  টেবিলে রয়েছে ২০০ টি চেয়ার। তারা বসে পড়েন। এই সকালে ২০০ জন পাঠকের প্রত্যেকের সামনেই শোভা পায় বিসিএস প্রস্তুতি, শিক্ষক নিয়োগ গাইড বই, ব্যাংকে নিয়োগ পরীক্ষা ইত্যাদি চাকরির প্রস্তুতি গাইড বই। আর প্রত্যেকের বইয়ের নিচে দেখা যায় বিশ্বের মানচিত্র।

পড়ছেন সবাই। আবার চেয়ার না পেয়ে কিছু সংখ্যক পাঠক বসে পড়েছেন বইয়ের তাকের ফাঁকা স্থানে। এমন পাঠকের সংখ্যাও প্রায় ৫০’র কাছাকাছি। কিন্তু প্রশ্ন নিজেদের আনা বই পড়লে কেন গ্রন্থাগারে আসা। সরকারি বাঙলা কলেজ থেকে গণিতে সম্মান শেষ করা আরফানুল ইসলাম বলেন, পড়ালেখার জন্য চাই পরিবেশ। গ্রন্থাগার থেকে ভালো পরিবেশ আর হতে পারে না।

তারই বন্ধু নাসির হোসেন বলেন, এখানে অনেকেই একসঙ্গে একই উদ্দেশ্যে আসি। যেকোনো প্রয়োজনে একে অপরের সহযোগিতা পাই। আর সব থেকে বড় সুবিধা প্রয়োজনে যেকোনো বই পাওয়া যায়। আছে ফটোকপি করার সুবিধাও।

বেলা গড়িয়ে ১২টা। চেয়ার ফাঁকা করে চলে যাচ্ছেন কিছু পাঠক। কিন্তু রেখে যাচ্ছেন স্থান। বই খাতা থাকলেই তার দখলেই থেকে যায় স্থানটি। চেয়ারে বই রাখেন আফরিনা শারমিন। তিনি জানান, কোচিং করতে যাচ্ছেন পল্টনে। ফের ফিরবেন ঘন্টা দুয়েক পর। কিন্তু এই সময় বই রেখে দিয়েছেন নিজের আসন। এর কারণ হিসেবে জানান, ফিরে এসে বসার স্থান নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই এই ব্যবস্থা।

সময় হয় দুপুরের খাবারের। অধিকাংশরই ব্যাগে করে নিয়ে আসেন খাবার। এখানে আছে নামাজের ব্যবস্থাও। গ্রন্থাগারে তারা সারাদিন কাটান পাঠক হিসেবে।

চোখে পড়ে অন্যান্য পাঠকদের আনাগোনাও। কিন্তু স্থান মেলা দায়। যদিও বেলা গড়ানোর পরে মেলে কিছু ফাঁকা চেয়ার। তবে তা নেহায়েত কম। ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ পড়ছিলেন এক পাঠক। তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। নাম জীবন চৌধুরী। তার সঙ্গে এসেছেন তার সহপাঠী জেরিন খান জেইন। জেইন পড়ছিলেন ভ্রমণ কাহিনী। তারা বলেন, এখানে বসার স্থান পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় ৪০ মিনিট। দাঁড়িয়েই পড়েছি বেশ কিছু সময়।

দুপুরের পর থেকে চাকরিপ্রার্থীদের ভিড় কিছুটা কমতে থাকে। আবার আসতে শুরু করেন নতুন পাঠক। আবার দেখা মেলে কিছু সাধারণ পাঠকদের।

এসব চাকুরিপ্রার্থী পাঠকদের অধীনে থাকে গ্রান্থাগারের অধিকাংশ পত্র-পত্রিকা। সাধারণ পাঠকরা পাত্রিকার জন্য অপেক্ষা করেও অনেক সময় সুযোগ হয়ে ওঠে না। নিজেদের কেনা পত্রিকা হাতেও আসেন অনেকে। গ্রন্থাগারের নিচে সাইকেলে চেপে এক হকার বিক্রি করেন পত্রিকা। এই হকারেরও নিয়েছেন অন্যরকম ব্যবস্থা। পত্রিকা বিক্রি করছেন তিনি স্ট্যাপল করে। যাতে পড়তে সুবিধা।

সন্ধ্যা হতেই ফের কানায় কানায় পূর্ণ গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগার বন্ধ হয় রাত সাড়ে ৮টায়। গ্রন্থাগার বন্ধের আধাঘণ্টা আগে থেকে তাড়া দেয়া হয় প্রস্তুতি নেয়ার জন্য। তবে সাড়ে ৮টা পেরিয়ে যাবার পরেও রীতিমতো অনুরোধ করে বের করতে হয় গ্রন্থাগার থেকে। 


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ