জনবল সংকটে পাঠক হারাচ্ছে বরিশালের গণগ্রন্থাগার

বরিশাল বিভাগীয় গণগ্রন্থাগারের জরাজীর্ণ ভবন  © টিডিসি ফটো

বরিশাল বিভাগের জ্ঞানপিপাসু মানুষের একমাত্র স্থান গণগ্রন্থাগার জনবল সংকটে ভূগছে। ২০০৬ সালে বরিশাল সরকারী ব্রজমোহন কলেজ (বিএম কলেজ) মসজিদ গেটের বিপরীতে অত্যাধুনিকভাবে নির্মিত চার তলা এ ভবনের নিচতলায় চলছে দাফতরিক কার্যক্রম। দ্বিতীয় তলায় শিশু পাঠকদের জন্য উপযোগী বই রয়েছে।  সেখানে সকাল থেকে শিশু পাঠকরা উপস্থিত হয়।

এছাড়া তৃতীয় তলায় জন-সাধারণের জন্য বিজ্ঞানসহ নানান ধরণের বই রাখা হয়েছে। চতুর্থ তলায় পত্র-পত্রিকা রাখা হয়। নানা সমস্যা আর প্রচার-প্রচারণার অভাবে শুরু থেকেই বিশাল আয়োজনের এ গ্রন্থাগারটি পাঠক পাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিভাগীয় গ্রন্থাগার সূত্র জানায়, সেখানে মোট ৭৪ হাজার ৯৫৯টি বই রয়েছে। এর অনুকূলে নিবন্ধিত সদস্য রয়েছেন মাত্র ১০০ জন। সরেজমিন গিয়ে চার তলাবিশিষ্ট এ গ্রন্থাগারে পাঠকের তেমন উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

বই পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা জানান, এখানে প্রায় আধুনিক সব ধরনের বই রয়েছে। পাশাপাশি পাঠক যারা আসেন তাদের মধ্যে বেশিরভাগই শিক্ষার্থী। পাঠকক্ষ কিংবা পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বুক সর্টার পদ ও পাঠকক্ষ সহকারীর পাঁচটি পদের চারটি পদ শূন্য রয়েছে এ গ্রন্থাগারের। ফলে অনেক সময় নিয়ে বই খুঁজে নিচ্ছেন পাঠকরা।

গ্রন্থাগারের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলাপকালে গ্রন্থাগারের সহকারী পরিচালক খালিদ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ জানান, এখানে যে ধরনের জনবল প্রয়োজন তার অনেকটাই নেই। সর্বোচ্চ পদ উপ-পরিচালকসহ লাইব্রেরীয়ানের পদটিও দীর্ঘদিন শুন্য। এছাড়া ২৩টি পদের মধ্যে ১৩টি পদই শূন্য। তারপরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমরা। 

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের পাঠানোর জন্য বরিশালের প্রায় সব স্কুল ও কলেজে চিঠি দেয়া হয়েছে। কিছু শিক্ষার্থী এলেও কেউ নিয়মিত সদস্য হতে চায় না। পর্যাপ্ত কম্পিউটার ও উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ইন্টারনেটসহ ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে পাঠক সংখ্যা বাড়বে বলে তিনি জানান।

ভবনটির ভেতর ও বাইরের অবস্থা জরাজীর্ন থাকায় বিভিন্ন স্থানের পলেস্তরা খসে পড়ায় আতংকে থাকতে হচ্ছে সকলেরই। একসময় গ্রন্থাগারই ছিল মানুষের একমাত্র জ্ঞান আহরন কেন্দ্র। কিন্তু কালের বিবর্তনে কম্পিউটার, ইন্টারনেট সুবিধা এখন জ্ঞানপিপাসু মানুষকে নানমুখি করে তুলেছে। কোনো তথ্য প্রয়োজন হলে মাত্র একটি ক্লিকে ইন্টারনেট থেকে সব ধরনের তথ্য পাওয়া যায় বিধায় গ্রন্থাগারে তেমন পাঠক দেখা যায় না। লোকবল কম থাকায় মাত্র ১০জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে সম্পূর্ন গ্রন্থাগারটি পরিচালিত হয়। অথচ লোক থাকার কথা ছিল ১৭জন।

জানা গেছে, গ্রন্থাগারের প্রিন্সিপাল লাইব্রেরীয়ান কাম উপ-পরিচালক, সিনিয়র লাইব্রেরীয়ান, পিয়ন, ইলেকট্রিশিয়ান, চেকার, ডাটা এন্টিকারকসহ বিভিন্ন পদ শূন্য রয়েছে। 

এখানকার গ্রন্থাগারের ইতিহাস অনেক পূরনো। নগরীর বিবির পুকুরের পূর্ব পাড়ে ১৮৫৪ সালে বরিশালে প্রথম গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ সেই আমলেই অতি পুরনো ইতিহাস সম্বলিত বই পত্রাদি সরবরাহ করত। গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার হিসেবে প্রায় আড়াইশ বছর হয়ে গেছে।

ইতিহাস গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, ১৮৫৪ সালে তৎকালীন জেলা জজ ক্যাম্পবেলের উদ্যোগে এবং অশ্বিনী কুমার দত্ত, বিণয়ভূষণ গুপ্ত এবং নওয়াব মীর মোয়াজ্জেম হোসেনের সহযোগিতায় বিবির পুকুরের পূর্ব পার্শ্বে প্রতিষ্ঠিত হয় বরিশালের প্রথম গ্রন্থাগার। ১৮৬১ সালে বরিশাল শহরে ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠে ব্রাহ্ম সমাজ গ্রন্থাগার। ধর্ম এবং দর্শন সম্পর্কিত নানা প্রকার পুস্তকে পাঠাগারটি বিশেষ সমৃদ্ধ ছিল।

সদররোডস্থ শহীদ মিনারের উল্টোদিকে ব্রাহ্ম সমাজের ঐ বাড়িটি এখন ধ্বংসস্তুপের মত দাঁড়িয়ে আছে। ১৯০৪ সালে শ্রী রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল আরো একটি গ্রন্থাগার। ১৯১০ সালে স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত শংকর মঠে গড়ে তোলা হয় একটি গ্রন্থাগার। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এখানকার সম্পূর্ণ সংগ্রহ লুট হয়ে যাওয়ায় পাঠাগারটি ধ্বংস হয়ে যায়।

বিভিন্ন স্থানে পাঠাগার আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯১২ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ বরিশালের ফকির বাড়িতে একটি শাখা স্থাপন করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময়ে এই সংগঠন এবং পাঠাগারটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। শহরের কালিবাড়ী রোডে ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্ম রক্ষিণী সভা ও কামিনী সুন্দরী চতুষ্পাটী। বরিশালের অধিকাংশ পুরনো পাঠাগারের মতো এই গ্রন্থাগারটিও বহু মূল্যবান পান্ডুলিপিসহ মক্তিযুদ্ধের সময়ে ধ্বংস হয়ে যায়।

১৯২২ সালে তরুন সংঘ নামের একটি পুরনো পাঠাগারের কথা জানা যায়। সম্ভবত যোগ্য পরিচালনার অভাবে পাঠাগারটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। একই বছর ফকির বাড়ি রোডে মোহামেডান লিটারির ক্লাব নামে আরো একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। কালের বিবর্তনে ঐ গ্রন্থাগারটিও ধ্বংস হয়। ৪০ দশকে বরিশালে প্রতিষ্ঠিত বেশ কয়েকটি গ্রন্থাগারের নাম জানা যায়। এসব গ্রন্থাগারের মধ্যে অশ্বিনী কুমার হলে নির্মল চন্দ্র দাশগুপ্ত স্মৃতি পাঠাগার এবং দপ্তরখানা রোডের প্রগতি পাঠাগার অন্যতম।

খান বাহাদুর হাসেম আলী খানের সহায়তায় ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পাঠক মজলিশ। একই বছর পর্তুগীজ জমিদার ডি সিলভার বাসভবনে গড়ে ওঠে বিদেশিদের জন্য একটি পাঠাগার। ৫০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যকেন্দ্রে পরিচালিত ইউএসআইএস গ্রন্থাগারটি পাঠক জগতে বিশেষ উৎসাহ সৃষ্টি করেছিল। প্রথমে সদর রোডে এবং পরবর্তী সময়ে হাসপাতাল রোডের গাঙ্গুলি বাড়িতে স্থাপিত এই গ্রন্থাগারটিতে দেশি এবং বিদেশি, বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার অজস্র পুস্তক পাঠকদের তৃপ্ত করতে সক্ষম ছিল। সত্তর দশকে এই সমৃদ্ধশালী গ্রন্থাগারটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

ষাটের দশকে শহরের আলেকান্দা অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় কিশোর মজলিস এবং নজরুল পাঠাগার নামের দুটি গ্রন্থাগার। ১৯৬৪ সালে ঝাউতলা রোডে প্রতিষ্ঠিত হয় পাঠচক্র নামের পাঠাগারটি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সোভিয়েত মৈত্রী সমিতির পরিচালনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মৈত্রী পাঠাগার। ১৯৭৫ সালে এই পাঠাগারটি বন্ধ হয়ে যায়।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ