‘নিশিন্দা নারী’ ব্যক্তি আল মাহমুদের প্রথম জীবনের উপাখ্যান

‘নিশিন্দা নারী’ লেখক আল মাহমুদের চেয়ে ব্যক্তি আল মাহমুদের প্রথম জীবনের উপাখ্যান বলা যায়। ১৯৯৫ সালে উপন্যাসটি লেখার সময় লেখক সবেমাত্র বাংলা একাডেমী থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। আমি ঠিক উপন্যাস বলবো না, বলবো নভেল্লা বা ছোট উপন্যাস। পূর্বের জীবনের কুহেলিকা পোড়ানো দিন আর জমে থাকা দ্রোহের রগরগা বর্ণনায় যাপিত এক বয়ানই নিশিন্দা নারী।

এই বর্ণনা কেবল মাত্র দ্রোহের মধ্যেই লেখক শেষ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি প্রকৃতির সচারচর নিয়মাবিষ্ট অবয়বের জের ধরেই একটি বিপ্লবের সূচনা দেখিয়েছেন এবং দেখিয়েছেন কিভাবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষেরা নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়, আর গগনবিদারী চিৎকার তুলে সমধিকার অন্দোলনে এক সমুদ্র ঝড় নিয়ে আসে।

আল মাহমুদের লেখা বেশ প্রকৃতি ঘনিষ্ট এবং আনন্দ কোলাহলে ভরা। নারী বর্ণনায় বেশ রগরগে বর্ণন, উত্তেজনার পশম দাঁড় করানো চিত্রণ। তিতাসের পাড় ঘেষে দাঁড়ানো কোনো এক গ্রামের গল্পের আবছায়ায় লেখক হাজার বছরের অনির্বাণ রক্তক্ষরণ এবং শোষণের সাথে সাথে মানুষের আবার জেগে উঠা আর বিদ্রোহের এক সম্মুখ বর্ণনা দিয়েছেন।

গল্পের মূল নায়ক নিশিন্দা। নায়ক-নায়িকা সবই সে। নিশিন্দা বেশ সুন্দর একটা ফুলের নাম হলেও আমাদের গল্পের নিশিন্দা বেশ প্রতিবাদী এবং সোচ্চার একজন নারীমূর্তি। জাতে চামার হলেও বিয়ে করেছেন এক মুসলিম মাঝি পরিবারের সন্তান আব্দুল্লাহকে। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের জন্য আব্দুল্লাহর আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত হলেও উপন্যাসটি একরকম একাই টেনে নিয়ে গেছেন নিশিন্দা চরিত্রটি। তার সাথে সঙ্গ দিয়েছেন গ্রামের শ্রমজীবীরা, সম্রাজ্যবাদের পা চাটা কিছু রাখাল,পুলিশ অফিসার আর হাতেগুনা কয়েকটা চরিত্র।

আল মাহমুদের উপন্যাসে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পিঠ টান করে দাঁড়ানো ছাড়াও আছে কাব্যিক গঠন, নারীর রূপের বর্ণনা, ধোঁয়া উঠা যৌন আবেশ। সবকিছু কাটিয়ে নিশিন্দা কি শত শত প্রতিকূলতা আর হাজার বছরের চলে আসা সমাজ ব্যবস্থাকে কাটিয়ে, কমান্ডোর মতো একা সম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ে যেতে পারবে? এই যুদ্ধে কি সে একা নাকি সঙ্গী হিসেবে পাবে কাউকে- এর জবাবই ছোট উপন্যাসে দেওয়া।

চরিত্র চিত্রনে আল মাহমুদ প্রকৃতির সাথে নারীর যে অমোঘ মিলন তা তুলে ধরেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। সাথে একটু আধটু ঝাল দিয়ে নিশিন্দাকে বেশ যৌবনে উপনীত এক নারীর প্রতিচ্ছবিতে এঁকেছেন নিখুঁতভাবে। অভাব, সমাজ এবং নারী এই তিনের উপর্যুপরি মিলনে আপনার মনে যে গভীর রেখাপাত ঘটাবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

আব্দুল্লাহ একপ্রকার ঝলসে যাওয়া কয়লার মতো একটা চরিত্র। যে পুড়ে গেছে, কিন্তু তার মধ্যে লাগা আগুন পোহাচ্ছে এখনো পুরো গল্প। পুলিশ এবং ম্যানাজার চরিত্রে লেখক বেশ প্রকটভাবে তুলে ধরেছেন ঘুনে খাওয়া সমাজের প্রতিটি মূর্তিকে। বাকী চরিত্রগুলোকে আমি প্রভাবক হিসেবে দেখবো।

যারা এই গল্পের অভিন্তা মূলত শুধুমাত্র সময়ের প্রয়োজনে। একটি চরিত্রের কথা অবশ্য না বললে আক্ষেপ থাকবে। খলিল। সম্রাজ্যবাদীদের পা চাটা কিছু চা পোষা প্রাণীর একটি হচ্ছে খলিল।

নামকরণে লেখক বেশ প্রজ্ঞার আশ্রয় নিয়েছেন বলে আমার ধারণা। নিশিন্দা প্রকৃত অর্থে একটি ব্যাথানাশক গাছের নাম। ছোট গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ, কিন্তু যার প্রায় সকল অংশ কাজে লাগে। নিশিন্দা ও তেমন। কখনো সে বউ হয়ে আব্দুল্লাহর ঘর সামলাবে আবার কখনো প্রয়োজনে রক্তজবার মতো ফেটে পড়বে দ্রোহের আগুনে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সমাজের অগ্রন্থিত ব্যাথানাশ করে দিবে রামদার কোপে। লেখক এই দিক দিয়ে সম্পূর্ণ স্বার্থক আমি বলবো।

লেখকের বাচনভঙ্গি নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই। কিছুটা কাব্যিক, কিছুটা নিগূঢ় অপরিণত সত্যবচন, কিছুটা জীবনবোধ। কথোপকথনগুলো লেখকের জন্মস্থান তিতাস পাড়ের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার।

আল মাহমুদের কথাসাহিত্যে কাব্যিক আবহ আছে; রয়েছে সৌন্দর্য আর প্রকৃতিনিবিড়তার ঘনিষ্ঠ ছবি। তার তৈরী পটভূমি চিরন্তন, মেঘে ডুবে থাকা সূর্যের। খুব তাড়াতাড়িই তা আলো ছড়াবে। উপন্যাসের বাচনে আশা, কল্প, স্বপ্ন সংগোপনে জাগ্রত। তবে অন্যদের মতো আমার কাছেও মনে হয়, লেখক এতটা অশ্লীল না লিখলেও পারতেন।

আবার অনেকের সাথে মতের মিল রেখে এটাও বলবো, তার লেখার বিচার এখন সময়ের কাছে! লেখক তার অকৃত্রিম মমতায় শিল্পের বুননে এক একটি সোনাঝরা অক্ষর যেভাবে পুঁতে গেছেন আপন কৌশলে, তা আপনাকে বেশ উদ্ভেলিত করবে বলেই অধমের ভাবনা।

লেখক: শিক্ষার্থী, বুয়েট


মন্তব্য